ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
তরুণ জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির শক্তি, কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংকের

তরুণ জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির শক্তি, কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংকের

বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে অনুকূল জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর কারণে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকায় এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে। তবে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, নারীর শ্রমবাজারে কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবের কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাড়ছে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা, কিন্তু তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়।বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য দেশের হাতে রয়েছে প্রায় দুই দশক। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেরি হলে জনসংখ্যার এই সুবিধাই ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিবর্তন এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে বিশ্বব্যাংক।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি সময় পাচ্ছে। তবে এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে অঞ্চলটি বার্ধক্যপ্রবণ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। তখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশও ২০৫১ সালের মধ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীপ্রধান দেশে পরিণত হতে পারে।জনমিতিক লভ্যাংশের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবছর গড়ে অতিরিক্ত ০.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১.১ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর কারণে পাওয়া এই সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০০০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার বার্ষিক অবদান কমে ০.১ শতাংশে নেমে আসবে।বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো আগের তুলনায় দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। তাঁর মতে, কর্মক্ষম মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি সুস্থ প্রবীণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থানের ঘাটতি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুকূল জনসংখ্যার বয়সকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ সীমিত, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কম এবং কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সংখ্যার হিসাবে এই কর্মীর পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেককে আনুষ্ঠানিক চাকরির পরিবর্তে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতিও ধীর। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করেছে।বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেছেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করছে এখন নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও অবসরকালীন আয়ের নিশ্চয়তা দিতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার দুর্বলতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও অনেকের জন্য সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং পেনশনব্যবস্থা প্রবীণদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। অন্যদিকে প্রবীণদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান। বিশ্বব্যাপী পেনশন সুবিধা পাওয়ার হারের তুলনায় এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দুই ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রথমত, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করা, ব্যবসায়িক বিধিবিধান সরল করা এবং শিক্ষা ও দক্ষতার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের কর্মক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।দ্বিতীয়ত, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং কার্যকর পেনশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে তাঁদের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। দীর্ঘ মেয়াদে যা অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার বয়সকাঠামোয় পরিবর্তন একদিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এই বিশাল সম্ভাবনাকে কতটা উৎপাদনশীল কাজে লাগানো সম্ভব হবে। সময় থাকতে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর অংশগ্রহণ এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকর সংস্কার করা না গেলে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।