কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট না করে সাশ্রয়ী উপায়ে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
মঙ্গলবার
সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন
কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ
সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পবিত্র
কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান
শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব
করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী
ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট
কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এ প্রদর্শনীর
আয়োজন করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই,
সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ
স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি
পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা
এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ
ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ
নেওয়া হয়েছে।
২০৩০
সালের
মধ্যে
বিদ্যুতের ২০
শতাংশ
নবায়নযোগ্য উৎস
থেকে
তারেক
রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে
দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার
২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের
মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য
জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য
নির্ধারণ করেছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ
সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে প্রাথমিকভাবে
১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার
তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে জানিয়ে
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আরও অর্থের সংস্থান
করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি
খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যাতে
অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সে
বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করতে চায়।
তিনি
বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু
সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং
অনিবার্য বাস্তবতা।
উদ্ভাবনী
উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী
বলেন, কয়েকজন তাঁদের নতুন ধারণা উপস্থাপন
করে পুরস্কৃত হয়েছেন। ভবিষ্যতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে জ্ঞান ও
উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একটি উদ্ভাবনী ধারণা
দেশের জন্য বড় পরিবর্তন
আনতে পারে।
তারেক
রহমান বলেন, তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী ধারণা
যাতে অর্থের অভাবে হারিয়ে না যায়, সে
জন্য চলতি বাজেটে স্টার্টআপ
খাতে বছরে ৫০০ কোটি
টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আমদানিনির্ভরতার কারণে
জ্বালানি সংকট
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। ফলে
বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিঘ্ন
সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে
সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি
জানান, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে
বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার
কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে
সরকার।
তারেক
রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের
চাহিদা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজেলের মজুত বাড়ানো হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ
ও মজুত নিশ্চিত করার
উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতিমধ্যে ৬০০
কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া
হয়েছে।
বিগত
সরকারগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তা
নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা
বা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায়
সময় নষ্ট না করে
ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর ভাষায়, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
সরবরাহ নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের
প্রধান অগ্রাধিকার।
গ্রীষ্মের আগে
৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য
সৌরবিদ্যুৎ
স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ
করতে সরকার ইতিমধ্যে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে বলে জানান তারেক
রহমান। এ খাতে বিনিয়োগ
বাড়াতে নীতিসহায়তা, কর ও শুল্ক
সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার
ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী
আশা প্রকাশ করেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে
৩ থেকে ৪ হাজার
মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি
বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত
ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগাতে চায়
সরকার।
নেট
মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা নিজেদের ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। এ
ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি
মাসের মধ্যে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০
পয়সা দরে তাঁদের কাছ
থেকে বিদ্যুৎ কেনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি প্রণোদনাও দেওয়া হবে।
তারেক
রহমান বলেন, ইতিমধ্যে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।
নিজের বাসায়ও তিনি সৌর প্যানেল
স্থাপন করেছেন। সেখান থেকে নিজেদের ব্যবহারের
পর অতিরিক্ত কিছু বিদ্যুৎ জাতীয়
গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ
সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে
একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান
জানিয়ে তিনি বলেন, এ
খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি যন্ত্রপাতির দাম কমানোর উদ্যোগ
নেওয়া হচ্ছে। জনগণের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোও সরকারের
অগ্রাধিকার।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব
সৌরবিদ্যুৎ
খাতের সেবাদাতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা
স্থাপনের পর সেটি ঠিকভাবে
কাজ করছে কি না,
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং
গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি
না, তা নিশ্চিত করতে
হবে।
বিদ্যুৎ
বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর
প্রতি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের
সমস্যা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব
দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষি
খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে
তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি
মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত
সেচপাম্প সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন
খরচ কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে এবং জাতীয় গ্রিডের
বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সরকারের দায়িত্ব।
অন্যদিকে বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী
ব্যবহার নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব।
এ জন্য দিনের বেলায়
যথাসম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহারের
পাশাপাশি বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে
অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা ও অন্যান্য
বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখার আহ্বান
জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের সুযোগ
পাবেন
প্রবাসীরাও
নবায়নযোগ্য
জ্বালানির প্রসারে উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে
তারেক রহমান বলেন, শুধু বড় প্রকল্প
নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ
স্থাপনের উদ্যোগেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার
সুযোগ রয়েছে। এ খাতে প্রবাসী
বাংলাদেশিরাও সহজে বিনিয়োগ করতে
পারবেন।
তিনি
বলেন, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ
সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ
উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, ‘আসুন, আমরা সূর্যের আলোকে
দেশের সম্পদে পরিণত করি। বর্তমান এবং
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ,
স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ
গড়ে তুলি।’
অনুষ্ঠানে
প্রধানমন্ত্রী ‘স্ফুরণ: টেকসই জ্বালানি উদ্ভাবনের খোঁজে ২০২৬’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে তাঁদের সঙ্গে
ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি।
এর আগে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা
নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন
করা হয়।
অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।