ঢাকা    মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের


মো: পলাশ তুষার পাঠান
মো: পলাশ তুষার পাঠান স্টাফ রিপোর্টার

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
ছবি: সংগ্রহ

সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের দেওয়া টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি—এমন তথ্য উঠে এসেছে সরকারি গবেষণায়। এতে দেশে ব্যবহৃত টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনজন ইমিউনোলজিস্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জন্য টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু দাম কিংবা সরবরাহের পরিমাণ বিবেচনা করলেই চলবে না। টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই জনস্বার্থে টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক বিশ্লেষণ প্রকাশের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, বহুল আলোচিত বঙ্গভ্যাক্সের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তাঁরা প্রথম জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। সম্প্রতি পাঁচ কোটি শিশুকে দেওয়া টাইফয়েড টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহুল ব্যবহৃত একটি টিকার পরিবর্তে নতুন টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্তের পেছনে কী বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত যুক্তি ছিল, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

গত ২৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত আইইডিসিআরের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, হামের টিকা নেওয়া ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫ জনের (২৭ দশমিক ৫ শতাংশ) রক্তে হামের অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়া গেছে। আরও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরীক্ষার ফল ছিল অনিশ্চিত বা বর্ডারলাইন। বিপরীতে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া যায়।

২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার পর সেপ্টেম্বরে এই গবেষণা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল দেশের কোটি কোটি শিশুর জন্য সংগ্রহ করা টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ও উন্নত দেশগুলোর টিকায় পার্থক্য

বাংলাদেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে সাধারণত এমআর (MR) টিকা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রধানত এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়া হয়, যা হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া জলবসন্ত প্রতিরোধের উপাদান যুক্ত এমএমআরভি (MMRV) টিকাও ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এমএমআরভি ব্যবহার শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে জিএসকের PRIORIX, মার্কের M-M-R II এবং ProQuad। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে M-M-RVAXPRO ও Priorix-Tetra।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভারতের Serum Institute of India (SII) এবং Biological E-এর এমআর টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রি-কোয়ালিফিকেশন পেয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাজ্যে এসব টিকার নিয়মিত বাজারজাতকরণের অনুমোদন নেই বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁদের মতে, কোটি কোটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিকা নির্বাচনে এফডিএ ও ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আগের গবেষণা ও সাম্প্রতিক ফলাফলে বড় পার্থক্য

বাংলাদেশে এমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b) একাধিক গবেষণা পরিচালনা করেছে। ২০১৬ সালে Journal of Infectious Diseases-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রায় কিছু পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।

তবে ২০২৫ সালে The Lancet Child & Adolescent Health সাময়িকীতে প্রকাশিত ২০১৭-১৮ সালের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই গবেষণায় ৯ মাস বয়সে টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ২৯২ শিশুর প্রায় ১০০ শতাংশের শরীরে হামের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।

এমনকি ছয় মাস বয়সে এমআর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া শিশুদের মধ্যেও ৯৪ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতির (Stunting) হার ছিল দুই দলে যথাক্রমে ১০ ও ১২ শতাংশ। উচ্চতার তুলনায় ওজন কম বা ওয়েস্টিংয়ের (Wasting) হার ছিল যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অপুষ্টি ও কম বয়সের মতো বিষয় থাকার পরও আগের গবেষণায় প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। সে তুলনায় ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি পজিটিভের হার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

তবে তাঁরা মনে করেন, শুধু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সফল ফল দিয়ে কোনো টিকার দীর্ঘমেয়াদি গুণগত মান নিশ্চিত করা যায় না। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে একই মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

টিকার উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কেন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হামের টিকা সাধারণ রাসায়নিক ওষুধের মতো নয়। এটি জীবন্ত দুর্বলকৃত ভাইরাস (Live Attenuated Virus) ব্যবহার করে তৈরি একটি সংবেদনশীল জৈবপ্রযুক্তিগত পণ্য। টিকা উৎপাদনে ব্যবহৃত কোষের বৈশিষ্ট্য, কাঁচামালের মান, উৎপাদন পরিবেশ এবং ফ্রিজ-ড্রাইং প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও এর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে টিকা উৎপাদনে ব্যাচভিত্তিক গুণগত সামঞ্জস্য বা Batch-to-batch consistency অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান কয়েকটি ভালো মানের টিকা উৎপাদন করতে পারলেই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের FDA এবং ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) টিকার ক্লিনিক্যাল গবেষণার পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনকেন্দ্রের কার্যক্রমেও কঠোর নজরদারি করে।

অপুষ্টি ও কোল্ড চেইনই কি ব্যর্থতার কারণ?

সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়ার পেছনে শিশুদের অপুষ্টি, কম বয়স কিংবা টিকা সংরক্ষণের ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণকে এককভাবে দায়ী করার আগে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

তাঁরা ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর পরিচালিত এমআর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উদাহরণ দিয়েছেন। ওই গবেষণায় অপুষ্টির উপস্থিতি এবং কম বয়সেও অধিকাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করতে শুধু বয়স ও অপুষ্টিকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।

টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোল্ড চেইন ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁরা। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় দেশে টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য একটি বিস্তৃত অবকাঠামো রয়েছে।

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি নথির বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার মহাখালীতে ইপিআইয়ের সংরক্ষণাগারে ৩৮টি কোল্ডরুম ও ফ্রিজাররুম রয়েছে। এসব স্থাপনায় প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।

তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রাগত ত্রুটি বা সংরক্ষণজনিত সমস্যার প্রমাণ ছাড়া কোল্ড চেইনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। একইভাবে উৎপাদন পর্যায়েই কোনো টিকার কার্যক্ষমতা অপর্যাপ্ত থাকলে উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

FDA ও EMA অনুমোদনের গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার গুণগত মান যাচাইয়ে FDA ও EMA-এর মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্থা টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং উৎপাদনকেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ করে।

ইউরোপে OCABR নামে একটি স্বাধীন সরকারি ব্যাচ যাচাইব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাধীন পরীক্ষাগারেও টিকার প্রতিটি ব্যাচের মান যাচাই করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক মূল্যায়নকে টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত।

ভারতে টিকা উৎপাদনের প্রায় ১২৫ বছরের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা সরবরাহে Serum Institute of India গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের নিজস্ব গবেষণায় উদ্ভাবিত কোনো টিকা FDA বা EMA-এর অনুমোদন পায়নি। এ বিষয়টিও বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।

টিকা কেনায় স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্তের তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত এমএমআর টিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এসব টিকার নিয়মিত ব্যবহারের বয়স সাধারণত ১২ মাস থেকে শুরু হয়। ইউরোপের কিছু ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সেও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে এসব টিকা ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন তাঁরা। কোনো বিজ্ঞানী নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের টিকা নিয়ে গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে টিকা নির্বাচন ও চূড়ান্ত ক্রয় সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের বিরত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, বরং টিকার উৎপাদনগত মান, অ-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।

এ ছাড়া দেশে বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধানের মতো মৌলিক জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, বিদেশি অর্থায়ন ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকেন্দ্রিক আর্থিক স্বার্থের কারণে কখনো কখনো জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত অগ্রাধিকার আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা অনৈতিক ও জনস্বার্থবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।

শিশুদের টিকার মান নিয়ে আপস নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সাম্প্রতিক হামের টিকার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ ফলাফলের কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা, উৎপাদনপ্রক্রিয়া যাচাই এবং টিকার প্রতিটি ব্যাচের গুণগত মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু কত কোটি ডোজ কেনা হচ্ছে কিংবা কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি ডোজের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে টিকার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিবেদনটির লেখক ড. রেজাউল করিম নেদারল্যান্ডস-প্রবাসী ইমিউনোলজিস্ট। তিনি বায়োলজিকস ও টিকা উদ্ভাবন এবং মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ। ড. জুবায়ের রহমান যুক্তরাষ্ট্রের একজন ইমিউনোলজিস্ট। আর ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের বায়োটেক বিভাগের সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার (R&D) এবং বাংলাদেশ বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি।

বিষয় : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হামের প্রাদুর্ভাব হামের টিকা টিকার কার্যকারিতা আইইডিসিআর গবেষণা

দৈনিক নবকাল

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের দেওয়া টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি—এমন তথ্য উঠে এসেছে সরকারি গবেষণায়। এতে দেশে ব্যবহৃত টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনজন ইমিউনোলজিস্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জন্য টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু দাম কিংবা সরবরাহের পরিমাণ বিবেচনা করলেই চলবে না। টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই জনস্বার্থে টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক বিশ্লেষণ প্রকাশের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, বহুল আলোচিত বঙ্গভ্যাক্সের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তাঁরা প্রথম জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন। সম্প্রতি পাঁচ কোটি শিশুকে দেওয়া টাইফয়েড টিকার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বহুল ব্যবহৃত একটি টিকার পরিবর্তে নতুন টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্তের পেছনে কী বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত যুক্তি ছিল, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

গত ২৭ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত আইইডিসিআরের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, হামের টিকা নেওয়া ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫ জনের (২৭ দশমিক ৫ শতাংশ) রক্তে হামের অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়া গেছে। আরও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরীক্ষার ফল ছিল অনিশ্চিত বা বর্ডারলাইন। বিপরীতে ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি পজিটিভ পাওয়া যায়।

২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার পর সেপ্টেম্বরে এই গবেষণা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল দেশের কোটি কোটি শিশুর জন্য সংগ্রহ করা টিকার উৎপাদনগত মান, কার্যকারিতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ও উন্নত দেশগুলোর টিকায় পার্থক্য

বাংলাদেশে হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে সাধারণত এমআর (MR) টিকা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রধানত এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়া হয়, যা হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া জলবসন্ত প্রতিরোধের উপাদান যুক্ত এমএমআরভি (MMRV) টিকাও ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এমএমআরভি ব্যবহার শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে জিএসকের PRIORIX, মার্কের M-M-R II এবং ProQuad। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত টিকার মধ্যে রয়েছে M-M-RVAXPRO ও Priorix-Tetra।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভারতের Serum Institute of India (SII) এবং Biological E-এর এমআর টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রি-কোয়ালিফিকেশন পেয়েছে। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাজ্যে এসব টিকার নিয়মিত বাজারজাতকরণের অনুমোদন নেই বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁদের মতে, কোটি কোটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টিকা নির্বাচনে এফডিএ ও ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মূল্যায়নও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আগের গবেষণা ও সাম্প্রতিক ফলাফলে বড় পার্থক্য

বাংলাদেশে এমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে অতীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b) একাধিক গবেষণা পরিচালনা করেছে। ২০১৬ সালে Journal of Infectious Diseases-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রায় কিছু পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।

তবে ২০২৫ সালে The Lancet Child & Adolescent Health সাময়িকীতে প্রকাশিত ২০১৭-১৮ সালের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই গবেষণায় ৯ মাস বয়সে টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ২৯২ শিশুর প্রায় ১০০ শতাংশের শরীরে হামের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল।

এমনকি ছয় মাস বয়সে এমআর টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া শিশুদের মধ্যেও ৯৪ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতির (Stunting) হার ছিল দুই দলে যথাক্রমে ১০ ও ১২ শতাংশ। উচ্চতার তুলনায় ওজন কম বা ওয়েস্টিংয়ের (Wasting) হার ছিল যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অপুষ্টি ও কম বয়সের মতো বিষয় থাকার পরও আগের গবেষণায় প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। সে তুলনায় ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি পজিটিভের হার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

তবে তাঁরা মনে করেন, শুধু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সফল ফল দিয়ে কোনো টিকার দীর্ঘমেয়াদি গুণগত মান নিশ্চিত করা যায় না। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে একই মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।

টিকার উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কেন কঠোর নজরদারি প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হামের টিকা সাধারণ রাসায়নিক ওষুধের মতো নয়। এটি জীবন্ত দুর্বলকৃত ভাইরাস (Live Attenuated Virus) ব্যবহার করে তৈরি একটি সংবেদনশীল জৈবপ্রযুক্তিগত পণ্য। টিকা উৎপাদনে ব্যবহৃত কোষের বৈশিষ্ট্য, কাঁচামালের মান, উৎপাদন পরিবেশ এবং ফ্রিজ-ড্রাইং প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিবর্তনও এর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে টিকা উৎপাদনে ব্যাচভিত্তিক গুণগত সামঞ্জস্য বা Batch-to-batch consistency অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান কয়েকটি ভালো মানের টিকা উৎপাদন করতে পারলেই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের FDA এবং ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) টিকার ক্লিনিক্যাল গবেষণার পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনকেন্দ্রের কার্যক্রমেও কঠোর নজরদারি করে।

অপুষ্টি ও কোল্ড চেইনই কি ব্যর্থতার কারণ?

সাম্প্রতিক গবেষণায় অ্যান্টিবডি নেগেটিভ পাওয়ার পেছনে শিশুদের অপুষ্টি, কম বয়স কিংবা টিকা সংরক্ষণের ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণকে এককভাবে দায়ী করার আগে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

তাঁরা ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশের শিশুদের ওপর পরিচালিত এমআর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উদাহরণ দিয়েছেন। ওই গবেষণায় অপুষ্টির উপস্থিতি এবং কম বয়সেও অধিকাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল ব্যাখ্যা করতে শুধু বয়স ও অপুষ্টিকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।

টিকা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোল্ড চেইন ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁরা। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় দেশে টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য একটি বিস্তৃত অবকাঠামো রয়েছে।

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একটি নথির বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার মহাখালীতে ইপিআইয়ের সংরক্ষণাগারে ৩৮টি কোল্ডরুম ও ফ্রিজাররুম রয়েছে। এসব স্থাপনায় প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডোজ টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।

তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রাগত ত্রুটি বা সংরক্ষণজনিত সমস্যার প্রমাণ ছাড়া কোল্ড চেইনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। একইভাবে উৎপাদন পর্যায়েই কোনো টিকার কার্যক্ষমতা অপর্যাপ্ত থাকলে উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

FDA ও EMA অনুমোদনের গুরুত্ব

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার গুণগত মান যাচাইয়ে FDA ও EMA-এর মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্থা টিকার গুণগত মান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, ব্যাচভিত্তিক সামঞ্জস্য এবং উৎপাদনকেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ করে।

ইউরোপে OCABR নামে একটি স্বাধীন সরকারি ব্যাচ যাচাইব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বাধীন পরীক্ষাগারেও টিকার প্রতিটি ব্যাচের মান যাচাই করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন ব্যবস্থার পাশাপাশি FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক মূল্যায়নকে টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত।

ভারতে টিকা উৎপাদনের প্রায় ১২৫ বছরের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা সরবরাহে Serum Institute of India গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের নিজস্ব গবেষণায় উদ্ভাবিত কোনো টিকা FDA বা EMA-এর অনুমোদন পায়নি। এ বিষয়টিও বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।

টিকা কেনায় স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত সিদ্ধান্তের তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে FDA ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনুমোদিত এমএমআর টিকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এসব টিকার নিয়মিত ব্যবহারের বয়স সাধারণত ১২ মাস থেকে শুরু হয়। ইউরোপের কিছু ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সেও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে এসব টিকা ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

টিকা নির্বাচন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন তাঁরা। কোনো বিজ্ঞানী নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের টিকা নিয়ে গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাঁর সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে টিকা নির্বাচন ও চূড়ান্ত ক্রয় সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের বিরত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, বরং টিকার উৎপাদনগত মান, অ-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়নই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।

এ ছাড়া দেশে বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সমাধানের মতো মৌলিক জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, বিদেশি অর্থায়ন ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকেন্দ্রিক আর্থিক স্বার্থের কারণে কখনো কখনো জনস্বাস্থ্যের প্রকৃত অগ্রাধিকার আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষকে পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা অনৈতিক ও জনস্বার্থবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।

শিশুদের টিকার মান নিয়ে আপস নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সাম্প্রতিক হামের টিকার অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ ফলাফলের কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা, উৎপাদনপ্রক্রিয়া যাচাই এবং টিকার প্রতিটি ব্যাচের গুণগত মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু কত কোটি ডোজ কেনা হচ্ছে কিংবা কত কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি ডোজের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে টিকার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিবেদনটির লেখক ড. রেজাউল করিম নেদারল্যান্ডস-প্রবাসী ইমিউনোলজিস্ট। তিনি বায়োলজিকস ও টিকা উদ্ভাবন এবং মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ। ড. জুবায়ের রহমান যুক্তরাষ্ট্রের একজন ইমিউনোলজিস্ট। আর ড. মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের বায়োটেক বিভাগের সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার (R&D) এবং বাংলাদেশ বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, মান যাচাইয়ে কঠোর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
0:00 0:00
1.0x