জাতিসংঘ সফরে কতটুকু অর্জন বাংলাদেশের?
জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর ঘিরে এখন
আলোচনায় উঠছে সরকার গঠনের
পর তাঁর প্রথম এই
আন্তর্জাতিক সফর থেকে বাংলাদেশ
কী পেল। সফরের সময়
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ
বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।সফরের
মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১১টি
উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। সফরের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা
স্মারকও সই হয়েছে। তবে
প্রধানমন্ত্রী নিজে এই দুই
চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।সরকারের
পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,
সফরের প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কে সফরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, সফরকালে
প্রধানমন্ত্রী ১১টি দেশের সঙ্গে
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। সাধারণ
পরিষদের অধিবেশনে ভাষণের পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
এবং প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতেও
অংশ নিয়েছেন তিনি।মাহদী
আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে সময়ের সর্বোচ্চ
ব্যবহার করা হয়েছে এবং
প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।রোহিঙ্গা ও জলবায়ু আলোচনায়কূটনৈতিক
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধান হিসেবে
তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফরের প্রতি বিশেষ নজর ছিল। বৈশ্বিক
ও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার
পাশাপাশি নতুন সরকারের অবস্থান
ও প্রত্যাশাও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা
করেছেন তিনি।সরকারের
পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি
জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তির
মতো বিষয়গুলো সফরে গুরুত্ব পেয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রে
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন,
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে
রোহিঙ্গা এবং জলবায়ু ইস্যু
বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।তিনি
বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই
ধরনের শ্রোতাকে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য
দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি ক্লাইমেট জাস্টিসের বিষয়ও এসেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের
দায়িত্ব ও তাদের করণীয়
তুলে ধরা হয়েছে।বাংলাদেশ
ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে ‘রোহিঙ্গা
সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই
সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ
দফা প্রস্তাব দেন।সেখানে
তিনি সতর্ক করে বলেন, রোহিঙ্গা
সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য
নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।সাত
বক্তব্য, একাধিক বৈঠকসফরে
প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি বক্তব্য
দিয়েছেন। এর মধ্যে জাতিসংঘ
সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে দেওয়া
ভাষণের পাশাপাশি সাইডলাইনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চারটি বক্তব্য দেন। এ ছাড়া
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি এবং উন্নয়ন
সহযোগীদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য
রাখেন তিনি।সফরের
বিভিন্ন পর্যায়ে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর
সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
এসব আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা
এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় উঠে আসে
বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো
হয়েছে।বিশ্বব্যাংকের
প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী
সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক
হাইকমিশনারের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে বলে
জানান মাহদী আমিন।আলোচনায় বোয়িংয়ের ১১
উড়োজাহাজপ্রধানমন্ত্রীর
সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়াই সফরের শুরুতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির ১১টি উড়োজাহাজ কেনার
চুক্তি হয়। এ নিয়ে
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক
প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।ঢাকায়
মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক পোস্টে বলা
হয়, আরও ১১টি বিশ্বসেরা
বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিতে পৌঁছানোয় বোয়িং ও বিমানকে অভিনন্দন।
পোস্টে এটিকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য আরেকটি অর্জন
হিসেবে উল্লেখ করা হয়।চুক্তির
পর মাহদী আমিন বলেন, বিমান
পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা
বিবেচনা করেই নতুন উড়োজাহাজ
কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তবে
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে বিপুল
অর্থ ব্যয়ে উড়োজাহাজ কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।এর
আগে ৩০ এপ্রিল ঢাকায়
বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে বোয়িংয়ের একটি চুক্তি হয়েছিল।
তখন প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ
কেনার কথা জানানো হয়।যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতাপ্রধানমন্ত্রীর
যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষ পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ
পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক
সই হয়।বাংলাদেশের
পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি বিষয়ক
উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের
পক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক আন্ডার
সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ সমঝোতায় সই করেন।বাংলাদেশে
রাশিয়ার সহযোগিতায় দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে নির্মাণাধীন থাকা অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের
সঙ্গে এ সমঝোতা নতুন
করে আলোচনায় এসেছে।শেখ
হাসিনার প্রসঙ্গও উঠেছেপ্রধানমন্ত্রীর
যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় নিউইয়র্কে মার্কিন
পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি ব্রিফিংয়ে শেখ
হাসিনা ও আওয়ামী লীগের
প্রসঙ্গও উঠে আসে।‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ওই ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তার
নাম প্রকাশ করা হয়নি। ‘একটি
স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ
এশিয়ার সমর্থনে মার্কিন নীতি’ শিরোনামের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকেরা
ছিলেন বলে বাংলাদেশের দুটি
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।শেখ
হাসিনাকে নিয়ে এক প্রশ্নের
জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন,
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক
অবস্থান নেয়নি। বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের
বৈরিতার বড় কারণ হয়ে
দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ
করেন।ওই
কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে ভারত
ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে
পৌঁছাবে। শেখ হাসিনার বিষয়ে
কী হওয়া উচিত, সে
বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নির্দিষ্ট কোনো
অবস্থান জানায়নি বলেও তিনি বলেন।‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে’সাবেক
রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, চব্বিশ-পরবর্তী
বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন।তিনি
বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন, সাইডলাইন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে
রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও ক্লাইমেট জাস্টিসসহ
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো
এসেছে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী
একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের
লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন।হুমায়ুন
কবির বলেন, সরকার গঠনের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর
এ ধরনের প্রথম সফর হওয়ায় বিভিন্ন
ইস্যু একসঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ
ছিল। সফরের লক্ষ্য, ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে
সম্পৃক্ত করার যে চেষ্টা
ছিল, তা ইতিবাচক বলেও
মন্তব্য করেন তিনি।আরেক
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন,
সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো এসেছে। তিনি পরিবর্তনগুলো তুলে
ধরার পাশাপাশি কী ধরনের সহযোগিতা
প্রত্যাশা করেন, সেটিও বলেছেন।
তাঁর
ভাষ্য, দ্বিপক্ষীয় পর্যায়েও বেশ কিছু আলোচনা
হয়েছে। মাত্র কয়েক মাস বয়সী
সরকারের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক্সপোজার গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন দেশের
সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে এটি সহায়ক হতে
পারে।