ঢাকা    রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল
Topic Ads 1
ফেসবুকে পরিচয়, কক্সবাজারে এক রাত এরপর তাজমিনের লাশ উদ্ধার

ফেসবুকে পরিচয়, কক্সবাজারে এক রাত এরপর তাজমিনের লাশ উদ্ধার

কুমিল্লার ফসলি জমি থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী তাজমিনের লাশ উদ্ধারের আগে সে গিয়েছিল পর্যটননগরী কক্সবাজারে। সেখানে এক রাত অবস্থানের পর বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পদুয়ারবাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর চালক মো. সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।তবে তাজমিন কেন কক্সবাজার গিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল এবং বাড়ি ফেরার পথে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি জমি থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তদন্তে উঠে আসে, কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে সে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।ফেসবুকে পরিচয়, এরপর কক্সবাজার যাত্রাঅনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায় সে। সেখান থেকে মুঠোফোনে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে রাজু বিকাশের মাধ্যমে তাকে ৫০০ টাকা পাঠান। পরে তাজমিন কক্সবাজারে পৌঁছায়।ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান এবং রিলস বিনিময়ের মধ্য দিয়ে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে তাঁদের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৭ দিন আগে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। অন্য একটি সূত্রের দাবি, তাঁদের পরিচয় প্রায় পাঁচ মাসের।রাজু প্রায় তিন বছর ধরে কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। তাজমিনের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি তার জন্য বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করেন।হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অবস্থানকক্সবাজার শহরের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা একটি হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানকারীরা জানতে পারেন, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রাজুর সঙ্গে ওই হোটেলে ওঠে তাজমিন।৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সময় তাঁরা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। হোটেলের রেজিস্টারে কিশোরীর নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। রাজুর পরিচয় দেওয়া হয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।হোটেলের এক কর্মীর ভাষ্য, রেজিস্টার খাতায় রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছিল। এক রাত অবস্থানের পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান।হোটেলটির ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মো. আবছার জানান, রাজুর জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হলেও তাজমিনের কোনো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়নি।অন্যদিকে, কলাতলীর একটি টিকিট কাউন্টারের পরিচালক আসহাব আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার রাতে তাঁর পরিচিত ২০ বছর বয়সী এক তরুণ এক কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কাটতে এসেছিলেন। তরুণটি কিশোরীকে নিজের বান্ধবী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।বাড়ি ফেরার টিকিট, এরপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর’-এর কাউন্টার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।রাজুর দাবি, পরিবারের সদস্যরা বারবার ফোন করায় তিনি তাজমিনকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। বাসভাড়ার টাকা না থাকায় ধার করে টিকিট কাটেন এবং ৫০০ টাকা দিয়ে তাকে বাসে তুলে দেন। তবে অন্য একটি অনুসন্ধানী সূত্রে টিকিটের মূল্য ৯০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় পৌঁছানোর পর তাজমিন তাঁকে জানায়, বাড়ির ফটক বন্ধ রয়েছে। পরে রেলস্টেশনে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়ে ওই ব্যক্তির বাসায় থাকার সিদ্ধান্তের কথাও বলে সে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে দাবি রাজুর।রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্যমতে, কুমিল্লায় ফিরে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে কথা হচ্ছিল। অটোরিকশাচালককে নিয়েও তাঁদের মধ্যে কথা হয়। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের ‘লাইভ লোকেশন’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।রাজুর দাবি, পরদিন সকালেও বহুবার ফোন করে তাজমিনের সাড়া পাননি তিনি। পরে এক বান্ধবীর মাধ্যমে কিশোরীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।পদুয়ারবাজার থেকে অটোরিকশায় উঠে যা ঘটেসিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে।পুলিশের তথ্যমতে, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া তাকে রেসকোর্সে না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।পরদিন, ৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।হত্যার খবরের পর রাজুর অবস্থান নিয়ে প্রশ্নতাজমিনের মৃত্যুর খবর জানার পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি হোটেল থেকে ছুটি নিয়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।তবে রাজুর এসব দাবি এবং তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাজমিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, কক্সবাজারে অবস্থান এবং পরবর্তী যোগাযোগের পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।মেয়ের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে যা বলছেন মাতাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তবে তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে শুধু এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা বলেছিল।তিনি মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তাজমিন কার কাছে আছে, তা স্পষ্ট করে না বলায় তা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।তদন্তে কী বলছে পুলিশলালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অধিকতর তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি। তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলেও জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রার কারণ, রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি এবং বাড়ি ফেরার পথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিভিন্ন দিক এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।