দিল্লি বিক্ষোভে মমতা-কেজরিওয়ালসহ ৪ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আটক
ভারতের
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের
বিরুদ্ধে বিরোধীদের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক
ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। শনিবার দিনভর চলা অভিযানে পশ্চিমবঙ্গের
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারসহ বিরোধী দলের বহু নেতা
ও আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক বিক্ষোভকারীর সংখ্যা
অন্তত ৩ হাজার।ককরোচ
জনতা পার্টির (সিজেপি) উদ্যোগে আয়োজিত এই বিক্ষোভ থেকে
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের
নাম বাদ দেওয়া হয়েছে,
যার ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয়
জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন
ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।শনিবার
সকাল থেকেই দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যন্তর
মন্তরে বিক্ষোভকারীদের জমায়েত ঠেকাতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর
সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন
সড়কে বসানো হয় ব্যারিকেড। কয়েকটি
মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ
রাখা হয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির
কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও স্থগিত করা হয়।বিমানবন্দর
থেকেই আটক সিজেপির নেতারাসিজেপির
পক্ষ থেকে জানানো হয়,
সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর
পর দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং নেতা আশুতোষ
রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে
বিমান থেকেই আটক করা হয়।বিমান
থেকে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে
অভিজিৎ দীপকেকে বলতে শোনা যায়,
তাঁরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে দিল্লিতে
এসেছেন। অথচ তাঁদের অপরাধীর
মতো আটক করা হচ্ছে
বলে অভিযোগ করেন তিনি।এর
আগে সিজেপির আইনি বিভাগের প্রধান
রত্না সিংকেও আটক করা হয়।
দলটির অভিযোগ, রাস্তায় গাড়ির ভেতর থেকে তাঁকে
আটক করে পুলিশ। এ
ছাড়া ইউটিউবার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামে তাঁর বাড়ি থেকে
আটক করা হয়েছে বলেও
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।মমতা-কেজরিওয়ালসহ বিরোধী নেতারা আটকদুপুরে
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি
পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে
আটক করে পুলিশ। যন্তর
মন্তরের দিকে যাওয়ার সময়
তাঁকে আটক করা হয়
বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।একই
দিন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আটক করা
হয়। তিনি দিল্লির সাউথ
অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ করছিলেন।
এ সময় তাঁর সঙ্গে
তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতাকেও আটক করা হয়।
তাঁদের মধ্যে রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন ও
দোলা সেন রয়েছেন।পুলিশের
পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে তাঁদের
কণ্ঠরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।পিনারাই
বিজয়নসহ বামপন্থী নেতারাও আটকবিক্ষোভে
অংশ নিতে গিয়ে কেরালার
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ একাধিক বামপন্থী নেতা আটক হন।
তাঁদের মধ্যে সিপিআই(এম)-এর সাধারণ
সম্পাদক এম এ বেবি,
বাম নেত্রী বৃন্দা কারাট, এম ভি গোবিন্দন
ও পি কে শ্রীমতীর
নামও রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে
জানানো হয়।সিপিআই(এম) সংসদ সদস্য
জন ব্রিটাস অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁদের কয়েকজনকে দীর্ঘ সময় দিল্লির বিভিন্ন
স্থানে ঘোরানোর পর ছত্রসাল স্টেডিয়ামে
নিয়ে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ
রাখার পর আবার অন্যত্র
নেওয়া হয়। তবে কোথায়
নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁদের
কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ
করেন তিনি।বামপন্থী
ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকেও আটক
করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া
যায়। আটকের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
দেওয়া এক বার্তায় তিনি
আন্দোলনকারীদের যেখানে বাধা দেওয়া হবে,
সেখানেই বসে প্রতিবাদ চালিয়ে
যাওয়ার আহ্বান জানান।গুরুদোয়ারা
থেকে মিছিলে বাধা, লাঠিচার্জের অভিযোগগত
রাত থেকে দিল্লির বাংলা
সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক শ বিক্ষোভকারী।
শনিবার সকালে তাঁরা যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে
যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা
দেয় এবং লাঠিচার্জ করে
বলে অভিযোগ ওঠে।বিক্ষোভকারীদের
দাবি, গুরুদোয়ারা এলাকায় প্রায় ৬০০ জন জমায়েত
হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনকে আটক
করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন
তাঁরা। তবে এই সংখ্যা
স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।হায়দরাবাদের
সফটওয়্যার প্রকৌশলী অজয় জিঙ্গাদের অভিযোগ,
সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা যন্তর
মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা
করছিলেন। বিপুলসংখ্যক পুলিশ তাঁদের আটকে দেয়। পরে
লাঠিচার্জ করে অনেককে বাসে
তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।দিল্লির
বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির খবরও পাওয়া যায়।
বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দিল্লি
হাট এলাকায় জড়ো হন। সিজেপি
নেতা আজিঙ্ক্যা শিন্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বান জানান, যেখানে আন্দোলনকারীদের থামানো হবে, সেখানেই যেন
তাঁরা প্রতিবাদ চালিয়ে যান।সাংবাদিক
ও আইনজীবীদের আটকের অভিযোগবিক্ষোভের
খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন
সাংবাদিক পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন
বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সুপ্রিম
কোর্টের সামনে প্রতিবাদ করা কয়েকজন আইনজীবীকে
আটকের খবর পাওয়া যায়।
পরে তাঁদের কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে
বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়।সিজেপির
অভিযোগ, দলটির কয়েকজন সদস্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবও বন্ধ করে দেওয়া
হয়েছে। তবে এ বিষয়ে
কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ভোটার
তালিকা থেকে ১৩ কোটি
নাম বাদ দেওয়ার তথ্যভারতে
ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন
ধরেই রাজনৈতিক উত্তেজনা চলছিল। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
এর ফলে নির্বাচনের ফলাফল
প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ভারতের
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই
প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের
নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া
হয়েছে। এর মধ্যে প্রায়
৬ কোটি ৩০ লাখ
মানুষের স্থানান্তর, ৩ কোটি মানুষের
খোঁজ না পাওয়া এবং
২ কোটি ৮০ লাখ
মানুষের মৃত্যুর বিষয় উল্লেখ করা
হয়েছে।কমিশনের
বক্তব্য, যাচাইয়ে চিহ্নিত নামগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে।
কোনো যোগ্য ভোটারের নাম ভুল করে
বাদ পড়লে তিনি পুনরায়
নিবন্ধন করতে পারবেন।অন্যদিকে,
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়নি। বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার
করে বলেছে, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও সরকারের অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ড।শনিবারের
ধরপাকড় ও বিক্ষোভে বাধা
দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার
নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা এবং বিরোধীদের প্রতিবাদ
করার অধিকার নিয়ে নতুন করে
বিতর্ক তৈরি হয়েছে।সূত্র:
বিবিসি