সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে ইরানের ২৩ বছর বয়সী তরুণী নাজমেহ আমিনিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করা ও সরকারবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর ছয় মাস এক দিন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ রায়ের বিরুদ্ধে ইরানের সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
অ্যাকাউন্টিংয়ের
শিক্ষার্থী নাজমেহ আমিনি বর্তমানে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ভাকিলাবাদ
কারাগারে বন্দী রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি পোস্টকে
কেন্দ্র করে মহানবীকে অবমাননার
অভিযোগ আনা হয়। ইরানের
আইন অনুযায়ী, এ অপরাধের শাস্তি
মৃত্যুদণ্ড।
জানুয়ারির বিক্ষোভের সময়
গ্রেপ্তার
২০২৬
সালের জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় আমিনিকে গ্রেপ্তার
করা হয়। ওই বিক্ষোভ
কঠোরভাবে দমন করেছিল দেশটির
কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিক্ষোভে হাজারো মানুষের নিহত হওয়ার কথা
বলা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ওই
সময় ৫০ হাজারের বেশি
মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
আমিনির
বিরুদ্ধে পৃথক মামলায় জাতীয়
নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করা এবং
সরকারবিরোধী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ আনা হয়। এসব
অভিযোগে তাঁকে ১২ বছর ছয়
মাস এক দিন কারাদণ্ড
দেওয়া হয়েছে।
কারাগার
থেকে ধারণ করা এক
অডিও বার্তায় আমিনি জাতিসংঘ, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর
কাছে তাঁর মামলাটি তদন্তের
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি
বলেন, তাঁর অনেক আশা
ও স্বপ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, তাঁকে হারানোর আশঙ্কায় তাঁর পরিবার প্রতিনিয়ত
উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
আদালতে যে
যুক্তি দিয়েছিলেন আমিনি
ইরানের
সংবাদপত্র খোরাসানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতে আমিনি দাবি করেন, বন্ধুদের
সঙ্গে হ্যালুসিনেশন সৃষ্টিকারী মাশরুম গ্রহণের পর বিভ্রমের মধ্যে
তিনি ওই পোস্ট দিয়েছিলেন।
তাঁর আইনজীবীও ঘটনাটিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে তুলে
ধরার চেষ্টা করেন।
তবে
বিচারক এ যুক্তি গ্রহণ
করেননি। বিভ্রমের মধ্যে থাকলে আমিনি কেন যুক্তরাষ্ট্র ও
ইসরাইলের মতো অন্য ব্যক্তি
বা সরকারের বিরুদ্ধে একই ধরনের মন্তব্য
করেননি, তা নিয়ে প্রশ্ন
তোলেন বিচারক।
ইরানের
ইসলামি দণ্ডবিধির ২৬২ ধারায় মহানবী
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার
শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে ২৬৩ ধারায়
অনিচ্ছাকৃত বক্তব্য, ভুলবশত বলা কথা কিংবা
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এমন মন্তব্যের ক্ষেত্রে
কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে। আমিনির
মামলায় এসব আইনি ব্যতিক্রম
কেন প্রযোজ্য হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন
তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে
উদ্বেগ
নরওয়েভিত্তিক
মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটসের
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ
পর্যন্ত ইরানে ৬০০-এর বেশি
মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
সংগঠনটির
পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার কারণে এক তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড
দেওয়ার ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার
জন্য উদ্বেগজনক নজির তৈরি করতে
পারে। তাঁর আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক
সম্প্রদায় কঠোর প্রতিক্রিয়া না
জানালে শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ আরও বাড়তে পারে।
ইরানে
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল।
এর আগে ২০২৩ সালের
৮ মে ইউসুফ মেহরদাদ
ও সদরোল্লাহ ফাজেলি-জারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত
অভিযোগে তাঁদের দণ্ড দেওয়া হয়।
আমিনির মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় মামলাটি আপিলের পর্যায়ে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাঁর সাজা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি এবং মৃত্যুদণ্ডের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।