ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশটিতে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে বিভিন্ন অভিযোগে দাবি করা হচ্ছে। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বড় শহরগুলোতে ‘ভোট চোর, গদি ছোড়’, ‘মোদি হটাও, ভারত বাঁচাও’ এবং ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ এ ধরনের স্লোগানকে কেন্দ্র করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন, শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয়করণ, বেকারত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক।
দেওয়া তথ্য
অনুযায়ী, আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের পাশাপাশি কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি
ও
বামপন্থী দলগুলোসহ বিরোধী
জোটের
নেতারা
অংশ
নিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ,
সরকারি
প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর
রাজনৈতিক প্রভাব
বৃদ্ধি
এবং
নাগরিকদের ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়ার
আশঙ্কা
ভারতের
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য
বড়
চ্যালেঞ্জ হয়ে
দাঁড়িয়েছে।
ভোটার তালিকা
নিয়ে বিতর্ক
আন্দোলনের অন্যতম
প্রধান
বিষয়
ভারতের
নির্বাচন কমিশনের ভোটার
তালিকা
সংশোধন
কার্যক্রম। অভিযোগ
উঠেছে,
‘বিশেষ
নিবিড়
সংশোধন’
বা
এসআইআর
(SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম
তালিকা
থেকে
বাদ
পড়েছে।
আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি,
বাদ
পড়া
ভোটারের সংখ্যা
প্রায়
১৩
কোটি।
তাঁদের
অভিযোগ,
এই
প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু মুসলমান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও
বিরোধী
দলগুলোর সমর্থকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে
পারেন।
এ ঘটনায়
ভারতের
প্রধান
নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও
সামনে
এসেছে।
বিরোধীদের অভিযোগ,
ভোটার
তালিকা
সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ
ও
নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে
না।
তবে
ভোটারদের নাম
বাদ
পড়ার
সংখ্যা,
তার
কারণ
এবং
রাজনৈতিকভাবে কাউকে
লক্ষ্যবস্তু করার
অভিযোগ
স্বাধীনভাবে যাচাই
করা
প্রয়োজন।
এ ছাড়া
নির্বাচন কমিশনের ইসিআই-নেট (ECINET) নামের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও
প্রশ্ন
উঠেছে।
অভিযোগ
রয়েছে,
এই
ব্যবস্থার কারণে
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হচ্ছে
এবং
যোগ্য
ভোটারদের নাম
তালিকা
থেকে
বাদ
পড়ার
ঝুঁকি
তৈরি
হচ্ছে।
নির্বাচন
কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে
বিতর্ক
নতুন
নয়।
তবে
ভোটার
তালিকা
সংশোধন
এবং
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে
অভিযোগের কারণে
বিষয়টি
আবারও
রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
দেওয়া তথ্যে
দাবি
করা
হয়েছে,
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর
সিং
সান্ধু
ও
বিবেক
জোশী
গত
১০
মাসে
প্রধান
নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত
১৪টি
লিখিত
আপত্তি
জানিয়েছেন। এসব
অভিযোগের সত্যতা
ও
প্রাসঙ্গিক নথি
যাচাই
করা
গেলে
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও
স্পষ্ট
ধারণা
পাওয়া
সম্ভব
হবে।
ভারতের সাবেক
প্রধান
নির্বাচন কমিশনার টি
এন
সেশনের
সময়
নির্বাচন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও
নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার যে
উদাহরণ
তৈরি
হয়েছিল,
তার
সঙ্গে
বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা
করছেন
সমালোচকেরা। তাঁদের
মতে,
নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায়
রাখতে
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং
স্বাধীনভাবে কাজ
করার
সক্ষমতা নিশ্চিত করা
জরুরি।
ছাত্র-তরুণদের
ক্ষোভের কারণ
আন্দোলনের আরেকটি
গুরুত্বপূর্ণ দিক
শিক্ষা
ও
কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অসন্তোষ। মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা এনইইটি
(NEET)-এর
প্রশ্নপত্র ফাঁসের
অভিযোগ,
সিবিএসইর মূল্যায়ন পদ্ধতি
নিয়ে
বিতর্ক
এবং
শিক্ষাব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির বিরোধিতা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
বাড়িয়েছে বলে
প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা
হয়েছে।
এর সঙ্গে
যুক্ত
হয়েছে
বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সীমিত
সুযোগ
এবং
তরুণদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে
উদ্বেগ। আন্দোলনকারীদের মতে,
শিক্ষাব্যবস্থা ও
চাকরির
বাজারে
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
এবং
প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না
হলে
তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থেকে
যাবে।
বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এবং
কংগ্রেসের ছাত্রসংগঠন এনএসইউআইয়ের মতো
সংগঠনগুলো আন্দোলনে ভূমিকা
রাখছে
বলে
দাবি
করা
হয়েছে।
একই
সঙ্গে
‘ককরোচ
জনতা
পার্টি’
(CJP) নামের
একটি
ব্যঙ্গাত্মক পরিচয়ও
আলোচনায় এসেছে।
তরুণদের এই
উদ্যোগকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি
অনাস্থার প্রতীক
হিসেবে
ব্যাখ্যা করছেন
আন্দোলনের সমর্থকেরা।
বিরোধী
জোটের সক্রিয়তা
ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে
বিরোধী
রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও
রাজনৈতিক মাত্রা
দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা
রাহুল
গান্ধী,
দলটির
সভাপতি
মল্লিকার্জুন খাড়গে,
তৃণমূল
কংগ্রেস নেত্রী
মমতা
বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির নেতা
অখিলেশ
যাদব,
তেজস্বী যাদব,
শারদ
পাওয়ারসহ বিরোধী
নেতাদের নাম
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উল্লেখ
করা
হয়েছে।
‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের ব্যানারে বিরোধী
দলগুলো
গণতন্ত্র রক্ষা,
নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি এবং
ভোটাধিকার নিশ্চিত করার
দাবিতে
একসঙ্গে কাজ
করছে
বলে
দেওয়া
তথ্যে
বলা
হয়েছে।
‘সেভ
ডেমোক্রেসি’ বা
‘গণতন্ত্র বাঁচাও’
কর্মসূচির মাধ্যমে এই
দাবিগুলো সামনে
আনার
কথাও
উল্লেখ
রয়েছে।
রাহুল গান্ধী
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে
দাঁড়িয়ে বিরোধী
রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখছেন
বলে
সমর্থকেরা মনে
করছেন।
তবে
আন্দোলনের ব্যাপ্তি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা
এবং
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের
প্রকৃত
ভূমিকা
সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য
প্রয়োজন।
দমন-পীড়নের
অভিযোগ ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন
আন্দোলন দমনে
পুলিশের কঠোর
অবস্থান, বিভিন্ন স্থানে
নিরাপত্তা জোরদার
এবং
মেট্রো
স্টেশন
বন্ধের
মতো
পদক্ষেপের অভিযোগ
উঠেছে।
কিছু
বর্ণনায় মোবাইল
ইন্টারনেট বন্ধ
ও
প্রায়
সাত
হাজার
মানুষকে গ্রেপ্তারের দাবিও
করা
হয়েছে।
এসব
তথ্যের
সত্যতা
নিশ্চিত করতে
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ
এবং
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই
করা
জরুরি।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ,
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং
বিরোধী
মতের
প্রতি
কঠোর
অবস্থান গণতান্ত্রিক অধিকার
চর্চার
সুযোগ
সংকুচিত করতে
পারে।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার
ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপের যৌক্তিকতা মূল্যায়নেও ঘটনার
নিরপেক্ষ তথ্য
প্রয়োজন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
নতুন
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘ব্লুমবার্গ নিউ
ইকোনমি
ফোরামে’
ভারতকে
‘গণতন্ত্রের জননী’
হিসেবে
তুলে
ধরেছেন
বলে
দেওয়া
তথ্যে
উল্লেখ
রয়েছে।
তবে
বিরোধী
রাজনীতিক ও
আন্দোলনের সমর্থকেরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং
ভোটাধিকার নিয়ে
ওঠা
প্রশ্নের সঙ্গে
এ
বক্তব্যের তুলনা
করছেন।
বাংলাদেশের
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা
ভারতের তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে
২০২৪
সালের
বাংলাদেশের জুলাই
আন্দোলনের তুলনাও
টানা
হচ্ছে।
বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন যেভাবে
ব্যাপক
রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে
গিয়েছিল, ভারতের
আন্দোলনকারীদের মধ্যেও
তেমন
প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে
বলে
সমর্থকদের কেউ
কেউ
মনে
করছেন।
তবে দুই
দেশের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্দোলনের কারণ
ও
সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট এক
নয়।
ফলে
দুই
আন্দোলনের মধ্যে
মিল
থাকলেও
সেগুলোকে সরাসরি
এক
করে
দেখার
সুযোগ
নেই।
মোদি সরকারের
সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার
পরও
নরেন্দ্র মোদি
সরকারকে বিভিন্ন সময়ে
নির্বাচন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও
নাগরিক
অধিকার
নিয়ে
সমালোচনার মুখে
পড়তে
হয়েছে।
বর্তমান আন্দোলনসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সত্য
হলে
ভোটার
তালিকার স্বচ্ছতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং
তরুণদের কর্মসংস্থানের মতো
বিষয়গুলো সরকারের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে
উঠতে
পারে।
ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি
নির্ভর
করে
শুধু
নিয়মিত
নির্বাচন আয়োজনের ওপর
নয়;
বরং
ভোটাধিকার রক্ষা,
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মুক্ত
গণমাধ্যম এবং
নাগরিকদের মতপ্রকাশের সুযোগ
নিশ্চিত করার
ওপরও।
তাই
ভোটার
তালিকা
নিয়ে
ওঠা
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত,
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং
শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের জবাব
দেওয়া
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা বিতর্কের পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের বাস্তব ব্যাপ্তি, বিরোধী দলগুলোর ঐক্য, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের ওপর।