জাপানে ভারতের আম রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষ্ণৌয়ের রেহমানপুর গ্রামের একটি ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) কেন্দ্রে আম রপ্তানির প্রস্তুতির সময় জাপানের কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শকেরা জীবাণুমুক্তকরণ, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি পান। এরপর ভারতীয় আমের চালান গ্রহণ স্থগিত করে জাপান।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে
বলা হয়েছে, ইয়োকোহামার উদ্ভিদ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৫ মার্চ বা
তার পর ইস্যু করা
পরিদর্শন সনদযুক্ত কোনো ভারতীয় আমের
চালান গ্রহণ করা হবে না।
রপ্তানি প্রক্রিয়ার মান উন্নত হয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত
হওয়ার পরই আম আমদানি
আবার শুরু হবে।
প্রায় দুই
দশক পর জাপানের বাজারে
ভারতের আম রপ্তানিতে এমন
বড় বাধা তৈরি হলো।
এর আগে ১৯৮৬ সালে
ফলমাছির ঝুঁকির কারণে ভারতীয় আম আমদানি নিষিদ্ধ
করেছিল জাপান। পরে ২০০৬ সালে
ভারত ভিএইচটি অবকাঠামো তৈরি, কীটপতঙ্গ পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং নিয়মিত পরিদর্শনে
সম্মত হলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
করা হয়।
ছয়
জাতের আম রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত
এবারের স্থগিতাদেশে
ভারতের ছয় জাতের আম—আলফানসো, কেসার, ল্যাংড়া, বানগানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা—প্রভাবিত হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত
আম রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর
হয়েছে।
পরিমাণের দিক
থেকে জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় আমের বাজার
নয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে
দেশটির গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপান
ভারত থেকে প্রায় ১৫
লাখ ৪০ হাজার ডলারের
তাজা ও প্রক্রিয়াজাত আম
আমদানি করেছিল।
জাপানের মতো
কঠোর মানদণ্ডের প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশাধিকার ভারতের আমের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার
গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত
হয়।
মুম্বাইয়ের আম
রপ্তানিকারক বিক্রম শাহ বলেন, ২০২৫
সালে তিনি প্রায় আড়াই
টন আম জাপানে রপ্তানি
করেছিলেন। তাঁর মতে, জাপান
সবচেয়ে বড় বাজার না
হলেও এই বাজার আন্তর্জাতিকভাবে
তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে কয়েক
বছর সময় ও অর্থ
বিনিয়োগ করতে হয়েছে বলেও
জানান তিনি।
মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরির
আলফানসো আমচাষি রাজেশ পাতিল বলেন, জাপানের কঠোর মানদণ্ড পূরণ
করতে তাঁদের পরিবার বাগান ব্যবস্থাপনা ও প্যাকেজিংয়ে বড়
বিনিয়োগ করেছে। স্থানীয় বাজারের তুলনায় জাপানে আমের দাম প্রায়
দ্বিগুণ পাওয়া যেত বলেও জানান
তিনি।
চাল
রপ্তানিতেও চীনের বাধা
শুধু আম
নয়, ভারতের চাল রপ্তানিতেও নতুন
সংকট তৈরি হয়েছে। গত
১৭ এপ্রিল চীন তিনটি ভারতীয়
চাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আমদানি লাইসেন্স বাতিল করে।
চীনের জেনারেল
অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের অভিযোগ,
চালের চালানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম বা জিএমও পাওয়া
গেছে।
ভারতের কৃষিপণ্য
রপ্তানিতে চালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির
২০ শতাংশের বেশি চাল থেকে
আসে। গত অর্থবছরে ভারতের
চাল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক
৫ বিলিয়ন ডলার।
কৃষি বিজ্ঞানী
এস কে সিংয়ের মতে,
চীনের এই পদক্ষেপ ভারতের
পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
এ ছাড়া
কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার অভিযোগে হংকং বেশ কিছু
ভারতীয় মশলা নিষিদ্ধ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভারতীয় জিরার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
মান
নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ
খাদ্য সুরক্ষা
বিজ্ঞানী অনন্যা বোস মনে করেন,
ভারতের বিচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা এবং পণ্যের উৎস
শনাক্ত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা
সমস্যার অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, থাইল্যান্ড,
ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলের মতো
প্রতিযোগী দেশ এ ক্ষেত্রে
অনেক বেশি উন্নত অবকাঠামো
গড়ে তুলেছে।
ভারতের ৮৬
শতাংশের বেশি কৃষক ক্ষুদ্র
ও প্রান্তিক হওয়ায় কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ আরও
কঠিন হয়ে পড়ে বলেও
তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থনীতিবিদ অনিল
গুপ্তের মতে, ভারত এতদিন
কৃষিপণ্যের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব
দিয়েছে। কিন্তু এখন বিশ্ববাজারে শুধু
উৎপাদনের পরিমাণ নয়, পণ্যের গুণগত
মানের প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বাণিজ্য
বিভাগের কর্মকর্তা উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, পরীক্ষাগারগুলোর
মানোন্নয়ন এবং নজরদারি আরও
কঠোর করতে পদক্ষেপ নেওয়া
হচ্ছে। ভারতীয় কৃষকেরা বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনে সক্ষম
হলেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্যের মান
নিয়ে আস্থা তৈরি করতে কার্যকর
ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন
বলে তিনি মনে করেন।
জাপান ও
চীনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে
এনেছে। ফলে শুধু উৎপাদন
বাড়ানো নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
অনুযায়ী উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত
প্রতিটি ধাপে পণ্যের নিরাপত্তা
ও মান নিশ্চিত করাই
ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র:
আলজাজিরা