প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং সমমর্যাদার উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ জনে। মন্ত্রিসভায় নতুন পাঁচজন যুক্ত হওয়া এবং একজনের বিদায়ের পর এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে। এর আগে শেখ হাসিনার সরকারের এক পর্যায়ে এ সংখ্যা ছিল ৭০ জন।
বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান
সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্ব পালন
করছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন খাতের
বিশেষজ্ঞ। কেউ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে,
আবার কেউ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট
মন্ত্রণালয়ে বসে দায়িত্ব পালন
করছেন।
সরকারের
পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,
প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার এবং সরকারের নীতি
ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে প্রয়োজনের
ভিত্তিতে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কারা কোন দায়িত্বে
বর্তমান
সরকারে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা
আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির
রিজভী আহমেদ, ইসমাইল জবিউল্লাহ, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
ও জহির উদ্দিন স্বপন।
প্রতিমন্ত্রীর
পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামছুল ইসলাম,
ড. মাহদী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ ও
ডা. জাহেদ-উর রহমান।
এ
ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিজন
কান্তি সরকার, ড. এস এম
জিয়াউদ্দিন হায়দার ও তানভীর গনি।
প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্বে রয়েছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ ও
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।
সচিব
পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী হিসেবে রয়েছেন রাশেদ খান, সাইমুম পারভেজ,
শাকিরুল ইসলাম খান ও গিয়াস
উদ্দিন রিমন। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় যুববিষয়ক
বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাঈদ
বিন আবদুল্লাহ।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দায়িত্বে উপদেষ্টারা
প্রধানমন্ত্রীর
রাজনৈতিক পরামর্শ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ
খাতের দায়িত্বে রয়েছেন মির্জা আব্বাস। অসুস্থতার কারণে তিনি বর্তমানে কার্যালয়ে
যেতে না পারলেও তাঁর
জন্য প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে দপ্তর ও প্রয়োজনীয় লোকবল
রয়েছে।
বিএনপির
স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক
বিষয়াদি দেখভালের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় তদারক
করছেন। সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তাঁর
দপ্তর প্রস্তুতের কাজ চলছে।
বিএনপির
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজনৈতিক
উপদেষ্টার দায়িত্বের পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর
দাপ্তরিক কার্যক্রমের জন্য তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়ে দপ্তর বরাদ্দ রয়েছে।
সাবেক
সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত বিষয়াদি তদারক করছেন। তিনি সচিবালয়ের নতুন
১ নম্বর ভবনে অফিস করেন।
অন্যদিকে, অর্থ ও পরিকল্পনা
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা রাশেদ আল
মাহমুদ তিতুমীর সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত
দপ্তরে কাজ করছেন।
সাবেক
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির
উদ্দিন স্বপন প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন। সরকারের
নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নেও
তিনি ভূমিকা রাখছেন।
প্রতিমন্ত্রীর
পদমর্যাদায় উপদেষ্টাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামছুল ইসলাম
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী
বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। ড. মাহদী আমিন
শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ
ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও
কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি
তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র হিসেবেও কাজ করছেন।
রেহান
আসিফ আসাদ ডাক, টেলিযোগাযোগ
ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। আর ডা. জাহেদ-উর রহমান পলিসি
ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার
এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষ সহকারীদের দায়িত্ব কী
প্রধানমন্ত্রীর
বিশেষ সহকারীরাও বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব পালন করছেন। বিজন
কান্তি সরকার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-সংক্রান্ত বিষয়াদি দেখভাল করছেন। তানভীর গনি সরকারের বিনিয়োগ
ও পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিষয় তদারক করছেন।
ড.
এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ড.
শাকিরুল ইসলাম খান এশিয়া-প্যাসিফিক
অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত বিষয় দেখভাল করছেন।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু
পরিবর্তন বিষয়ে দায়িত্বে রয়েছেন ড. সাইমুম পারভেজ।
প্রধানমন্ত্রীর
রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে কাজ করছেন রাশেদ
খান। যুব কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত
দায়িত্বে রয়েছেন সাঈদ বিন আবদুল্লাহ।
সর্বশেষ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত দায়িত্ব পেয়েছেন গিয়াস উদ্দিন রিমন।
মন্ত্রিসভার আকার ৫১ জন
সরকার
গঠনের ছয় মাসের মধ্যে
মন্ত্রিসভার আকার আরও বড়
হয়েছে। সম্প্রতি চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী
যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত
বিমান প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হয়েছেন।
অন্যদিকে, মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ে
মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়েছেন জহির উদ্দিন স্বপন।
প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
হয়েছেন হুমায়ুন কবির।
এই
পরিবর্তনের পর মন্ত্রিসভার আকার
দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। সংসদীয়
গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর এটি দেশের
তৃতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা হয়েছে।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বাইরে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের
অন্তর্ভুক্ত করলে সরকারের বিভিন্ন
পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালনকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে।
অতীতের সরকারের চিত্র
২০০১
সালের ১০ অক্টোবর খালেদা
জিয়ার তৃতীয় মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। সেই
মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ জন পূর্ণ
মন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী
ও চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সমমর্যাদার পদে
দায়িত্ব পালনকারীদের সংখ্যা ছিল ৬৪ জন।
২০০৯
সালে শেখ হাসিনার দ্বিতীয়
সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার আকার
বিভিন্ন সময়ে বেড়েছে। ২০১৩
সালের নভেম্বরে মন্ত্রিসভার আকার ৬১ জনে
পৌঁছায়। পরে নির্বাচনকালীন সরকার
গঠনের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসে। ওই সরকারের
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার পদে
দায়িত্ব পালনকারীদের সংখ্যা এক পর্যায়ে ৭০
জন হয়েছিল।
বর্তমান
সরকারের ৭১ জনের সংখ্যা
সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের ক্ষমতা কতটুকু
সংবিধানের
৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী,
সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে,
রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬-এর রুল ৩বি
অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও বিশেষায়িত বিভিন্ন
বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ
করতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উপদেষ্টারা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন এবং তাঁর
নির্দেশে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নিতে
পারেন। বিশেষ সহকারীরা প্রধানমন্ত্রীর দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজে সহায়তা, বিভিন্ন
দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় এবং কার্যক্রম তদারক
করেন।
তবে
উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা
সাধারণভাবে সরকারি ফাইল অনুমোদনের ক্ষমতা
রাখেন না। তাঁরা মূলত
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেন এবং সরাসরি
প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করেন।
সরকারের দাবি, বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করার মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোই এসব নিয়োগের উদ্দেশ্য। তবে এতসংখ্যক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব বণ্টন, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং তাঁদের কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে।