মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া রাখতে এবং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কৌশল পরিবর্তন করছে ইরান। দেশটির জ্যেষ্ঠ দুই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আশপাশের বিস্তৃত জলসীমায়ও হামলার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তেহরান।
বুধবার
(১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, প্রায় ১০ দিন আগে
ইরান এমন কিছু জাহাজের
বিরুদ্ধে হামলার ধরন ও গতি
পরিবর্তন করেছে, যেগুলোকে তারা নিজেদের আরোপিত
বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারী বলে মনে করে।
এর ফলে ওই ধরনের
জাহাজে হামলার সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানি
কর্মকর্তারা।
তাঁদের
ভাষ্য, নতুন কৌশলের অন্যতম
লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে মার্কিন
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে।
তেলের
দাম
কমানোর প্রচেষ্টায় বাধা
ইরানের
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের
বৈশ্বিক তেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টাকে
ব্যাহত করাই লক্ষ্য।’
অন্য
এক কর্মকর্তা বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তেলের দাম কমাতে দেওয়া
হবে না। তাঁর ভাষায়,
‘যখনই তারা ভাববে, দাম
কমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তখনই আমরা তাদের
সেই অবস্থান থেকে দূরে ঠেলে
দেব। এটি দাবার খেলা।’
ইরানি
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন কৌশল গ্রহণের
সিদ্ধান্ত দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের বিভিন্ন
অংশের মধ্যে এ বিষয়ে সমন্বয়
রয়েছে।
ছোট
নৌকায়
নজরদারি, লক্ষ্য চিহ্নিত করছে
ইরান
এক
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের রাডার সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস
হওয়ার পর দেশটির ইসলামিক
রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে ছোট নৌকায়
নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবহার শুরু করেছে। এসব
পর্যবেক্ষক মার্কিন নৌযানসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করে আইআরজিসিকে তথ্য
দিচ্ছেন বলে ওই কর্মকর্তা
দাবি করেন।
গত
সপ্তাহে এমনই একটি ঘটনায়
ইরানি পর্যবেক্ষকেরা একটি ধৌ নৌযান
থেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য পাঠাচ্ছিলেন বলে
মার্কিন সামরিক বাহিনী নির্ধারণ করে। পরে মার্কিন
বাহিনী নৌযানটির মুখোমুখি হয়, আরোহীদের নৌযান
ছেড়ে যেতে বলে এবং
সেটি ধ্বংস করে। মার্কিন কর্মকর্তার
ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কেউ
হতাহত হননি।
ওই
কর্মকর্তা আরও বলেন, নিজেদের
অবশিষ্ট দ্রুতগতির নৌযানগুলো ঝুঁকির মুখে ফেলতে না
চাওয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি
দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি
পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না। বিশেষ করে
মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনী ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এই পরিস্থিতি
তৈরি হয়েছে।
হরমুজের বাইরেও হামলার পরিধি
বাড়ানোর পরিকল্পনা
ইরানি
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন
কৌশলের অংশ হিসেবে হরমুজ
প্রণালির বাইরেও অভিযান বিস্তৃত করতে চায় তেহরান।
ওমান উপসাগর এবং আরও দূরের
জলসীমাও এর আওতায় আসতে
পারে।
সামুদ্রিক
নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা
গেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালির বাইরেও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব
ঘটনার মধ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব
আমিরাতের উপকূলসংলগ্ন জলসীমায় হামলার তথ্যও রয়েছে।
এক
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সাম্প্রতিক হামলার গতি বেড়েছে এবং
তা পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে।
গত
৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে
ট্যাংকারসহ বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে অন্তত পাঁচটি
ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীর
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) কাছে জানানো তথ্য
অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে
ড্রোন হামলাও রয়েছে।
জাতিসংঘের
নৌপরিবহন সংস্থা আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্যেও হামলার এই বৃদ্ধি প্রতিফলিত
হয়েছে। গত ৩ থেকে
৫ অক্টোবরের হামলার হারের সঙ্গে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তুলনা করে নতুন করে
উত্তেজনা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
‘শিগগিরই পুরোপুরি বন্ধ’ হতে পারে হরমুজ
হরমুজ
প্রণালিতে নিজেদের বিধিনিষেধ লঙ্ঘনকারী কোনো জাহাজকে চলাচল
করতে না দেওয়ার পরিস্থিতির
দিকে এগোচ্ছে ইরান—এমনটাই জানিয়েছেন
দেশটির দুই কর্মকর্তা। তাঁদের
একজন বলেছেন, ‘শিগগিরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’
যুদ্ধ
শুরুর আগে বিশ্বের মোট
তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক
গ্যাসের (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ
প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর
থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তেহরান। চলাচলে
বিধিনিষেধ ও জাহাজে হামলার
কারণে প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ
চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিকে
ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত
রয়েছে। তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ
বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ
করছে ওয়াশিংটন। সংঘাতের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে
ইরানকে চাপ দেওয়াই এসব
পদক্ষেপের লক্ষ্য।
মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা
বিবেচনা করছেন। তবে নির্বাচনের আগে
ইরানে আর হামলা চালাবেন
না বলে তিনি জানিয়েছেন।
জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা
ইরান
যুদ্ধ ও এর অর্থনৈতিক
ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারণায়ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের
কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মাসিক ব্যয় প্রায় ৩
বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
হরমুজ
প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে সরবরাহ
বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হামলার
হুমকি, জাহাজ চলাচলের বাড়তি খরচ এবং বিমার
উচ্চ ব্যয় স্বাভাবিক বাণিজ্যিক
চলাচল পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।
মার্কিন
নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) রোববারের সর্বশেষ প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকিকে ‘গুরুতর’
বলে উল্লেখ করেছে। এটি তাদের ঝুঁকি
মূল্যায়নের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তর।
সংস্থাটি
জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নজরদারি, ড্রোনের
উড্ডয়ন এবং ভিএইচএফ রেডিওতে
যোগাযোগের মাধ্যমে হয়রানিসহ আইআরজিসির হামলা ও হামলার চেষ্টা
অব্যাহত রয়েছে।
এ
বিষয়ে মন্তব্য জানতে পেন্টাগন ও ইরানের পররাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের
কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র:
রয়টার্স