ঢাকা    সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

কক্সবাজারের রিসোর্টে ‘সাইবার ল্যাব’, জব্দ প্রায় ২ হাজার আইফোন


কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজার প্রতিনিধি

কক্সবাজারের রিসোর্টে ‘সাইবার ল্যাব’, জব্দ প্রায় ২ হাজার আইফোন
ছবি: সংগ্রহ

কক্সবাজারের হিমছড়িতে পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি রিসোর্টের বড় হলরুমে গড়ে তোলা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাব। ছয়টি কক্ষ করা হয়েছিল শব্দরোধী। সেখানে কম্পিউটার, মনিটর বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা হয়েছিল। পুলিশের অভিযানে ওই রিসোর্ট থেকে হাজার ৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানিপ্রতিষ্ঠার কথা বলে চীনা তাইওয়ানের নাগরিকদের একটি চক্র রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিল। পরে রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেয় তারা। সেখানে বসেই আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক প্রতারণার কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশের অপরাধ তদন্তের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)

তবে রিসোর্টে থাকা বিদেশি নাগরিকদের সবাই এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জব্দ করা সরঞ্জামের ফরেনসিক পরীক্ষার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকায় আরও দুটি রিসোর্ট একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়েছিল চক্রটি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে এসব স্থানে দুই থেকে তিন শতাধিক চীনা তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন।

রিসোর্টে বিপুল সরঞ্জাম

গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালায় রামু থানার পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা কয়েকজন বিদেশি নাগরিক পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান। পরে রিসোর্টের হলরুম থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

পুলিশ জানায়, অভিযানে হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ২৪টি কানেকশন বোর্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

ছাড়া দুটি চীনা জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের দুটি র‌্যাংকব্যাজ, পুলিশ প্রতীকযুক্ত একটি টাই, চারটি গ্রামীণফোন একটি রবি সিম, ১৫টি নোটখাতা একটি ডায়েরিও জব্দ করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার পর চক্রটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এর ভেতরের কাঠামো পরিবর্তন করে। বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ তৈরি করা হয়। রিসোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও নিজেদের লোকজন দিয়ে পরিচালনা করত তারা।

কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অস্তিত্ব মেলেনি

পুলিশের অনুসন্ধানে রিসোর্ট ভাড়ার সঙ্গেবাবর আলীনামে এক চীনা নাগরিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, তাঁর প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তাঁর সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।

আরেক চীনা নাগরিক ওয়েইপিং নিজেকেজিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে পুলিশের অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান রিসোর্ট ভাড়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের পাসপোর্ট ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট বিশেষ শাখায় জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও এসব নাগরিকের ক্ষেত্রে এমন নথি পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের দাবি।

তিন দফায় অভিযান অনুসন্ধান

কক্সবাজার জেলা পুলিশ, জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়।

২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালানোর পরদিন ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। তারা সাইবার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন।

২৮ আগস্ট সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দলও রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।

পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, সিটিটিসির প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী, চক্রটি কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, নকল বা ভুয়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা নেওয়া, ‘এক্সিট ফ্রড অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইন আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকতে পারে।

তবে এসব কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন নিশ্চিত করতে জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

কক্সবাজার শহর থেকে গ্রেপ্তার ছয়জন

মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযানের পর কয়েকজন বিদেশি নাগরিক কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পায় পুলিশ। পরে কলাতলী এলাকার দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, চিয়ানশিয়ং ঝাং ঝেমিং। তাঁদের কাছ থেকে ছয়টি মোবাইল ফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়।

পলাতক চারজন হলেন ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, জিপিং জিয়ান ঝাং।

ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার সাইবার অপরাধ আইনে মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জন পলাতক চারজনের পাশাপাশি ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

গত শুক্রবার বিকেলে গ্রেপ্তার ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তে আরও যারা

পুলিশ বলছে, মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন কয়েকটি রিসোর্টে অবস্থান করা দুই থেকে তিন শতাধিক বিদেশির সবাই কথিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের একটি অংশকে ব্যবহার করে চক্রটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

রামু থানার ওসি কে ফজলুল হক বলেন, বিদেশিরা কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন, রিসোর্টে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন এবংজিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি দাবির পক্ষে বৈধ কাগজপত্র আছে কি নাএসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য রামু থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে।

তবে পরে বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ থাকায় তিনি আর মন্তব্য করতে পারবেন না।

চীনা নাগরিকদের রিসোর্ট ভাড়া দেওয়া এবং তাঁদের অবস্থানের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছিল কি না, তা জানতে মেরিনা বিচ ভিলা ইনানীর ড্রিম হলিডে রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠান দুটির সব মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে হোটেল অর্কিড ব্লুর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের হোটেলে ২৪ জন চীনা নাগরিক ছিলেন। তাঁদের বিষয়ে চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তাঁরা চীনা নাগরিক; আমাদের হোটেলে থাকতেন। এখানে তাঁরা কোনো কাজকর্ম করতেন না। শুনেছি, অন্য কোনো হোটেলে নাকি কম্পিউটার ল্যাব করেছিলেন।

পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং রিসোর্টগুলোতে পরিচালিত কথিত অনলাইন কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বিষয় : চীন তাইওয়ান নাগরিক অনলাইন প্রতারণার

দৈনিক নবকাল

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কক্সবাজারের রিসোর্টে ‘সাইবার ল্যাব’, জব্দ প্রায় ২ হাজার আইফোন

প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কক্সবাজারের হিমছড়িতে পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত একটি রিসোর্টের বড় হলরুমে গড়ে তোলা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাব। ছয়টি কক্ষ করা হয়েছিল শব্দরোধী। সেখানে কম্পিউটার, মনিটর বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা হয়েছিল। পুলিশের অভিযানে ওই রিসোর্ট থেকে হাজার ৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানিপ্রতিষ্ঠার কথা বলে চীনা তাইওয়ানের নাগরিকদের একটি চক্র রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিল। পরে রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নেয় তারা। সেখানে বসেই আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক প্রতারণার কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশের অপরাধ তদন্তের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)

তবে রিসোর্টে থাকা বিদেশি নাগরিকদের সবাই এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জব্দ করা সরঞ্জামের ফরেনসিক পরীক্ষার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকায় আরও দুটি রিসোর্ট একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়েছিল চক্রটি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে এসব স্থানে দুই থেকে তিন শতাধিক চীনা তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন।

রিসোর্টে বিপুল সরঞ্জাম

গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালায় রামু থানার পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা কয়েকজন বিদেশি নাগরিক পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যান। পরে রিসোর্টের হলরুম থেকে বিপুলসংখ্যক আইফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

পুলিশ জানায়, অভিযানে হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ২৪টি কানেকশন বোর্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

ছাড়া দুটি চীনা জাতীয় পতাকা, চীনা পুলিশের দুটি র‌্যাংকব্যাজ, পুলিশ প্রতীকযুক্ত একটি টাই, চারটি গ্রামীণফোন একটি রবি সিম, ১৫টি নোটখাতা একটি ডায়েরিও জব্দ করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, রিসোর্ট ভাড়া নেওয়ার পর চক্রটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এর ভেতরের কাঠামো পরিবর্তন করে। বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং ছয়টি শব্দরোধী কক্ষ তৈরি করা হয়। রিসোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও নিজেদের লোকজন দিয়ে পরিচালনা করত তারা।

কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অস্তিত্ব মেলেনি

পুলিশের অনুসন্ধানে রিসোর্ট ভাড়ার সঙ্গেবাবর আলীনামে এক চীনা নাগরিকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলছে, তাঁর প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তাঁর সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।

আরেক চীনা নাগরিক ওয়েইপিং নিজেকেজিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে পুলিশের অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান রিসোর্ট ভাড়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের পাসপোর্ট ভিসার কপি সংশ্লিষ্ট বিশেষ শাখায় জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও এসব নাগরিকের ক্ষেত্রে এমন নথি পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের দাবি।

তিন দফায় অভিযান অনুসন্ধান

কক্সবাজার জেলা পুলিশ, জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়।

২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযান চালানোর পরদিন ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। তারা সাইবার ল্যাব, শব্দরোধী কক্ষ বিদেশি নাগরিকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন।

২৮ আগস্ট সিটিটিসির উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দলও রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।

পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, সিটিটিসির প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী, চক্রটি কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, নকল বা ভুয়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা নেওয়া, ‘এক্সিট ফ্রড অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইন আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকতে পারে।

তবে এসব কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন নিশ্চিত করতে জব্দ করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

কক্সবাজার শহর থেকে গ্রেপ্তার ছয়জন

মেরিনা বিচ ভিলায় অভিযানের পর কয়েকজন বিদেশি নাগরিক কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পায় পুলিশ। পরে কলাতলী এলাকার দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন তাইওয়ানের ওয়েই ছিং ওয়েন এবং চীনের সু ইয়াংফান, ইয়ান চ্যাংশেং, সু হাইয়াং, চিয়ানশিয়ং ঝাং ঝেমিং। তাঁদের কাছ থেকে ছয়টি মোবাইল ফোন, পাঁচটি পাসপোর্ট তিনটি পরিচয়পত্র জব্দ করা হয়।

পলাতক চারজন হলেন ঝান ইউয়ান ফান ওরফে বাবর আলী, পাই লেডিং, জিপিং জিয়ান ঝাং।

ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার সাইবার অপরাধ আইনে মামলা করেন। মামলায় গ্রেপ্তার ছয়জন পলাতক চারজনের পাশাপাশি ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

গত শুক্রবার বিকেলে গ্রেপ্তার ছয়জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তদন্তে আরও যারা

পুলিশ বলছে, মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন কয়েকটি রিসোর্টে অবস্থান করা দুই থেকে তিন শতাধিক বিদেশির সবাই কথিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের একটি অংশকে ব্যবহার করে চক্রটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

রামু থানার ওসি কে ফজলুল হক বলেন, বিদেশিরা কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন, রিসোর্টে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন এবংজিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি দাবির পক্ষে বৈধ কাগজপত্র আছে কি নাএসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অহিদুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পাওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য রামু থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ আন্তর্জাতিক অনলাইন আর্থিক প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে।

তবে পরে বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ অহিদুর রহমান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ থাকায় তিনি আর মন্তব্য করতে পারবেন না।

চীনা নাগরিকদের রিসোর্ট ভাড়া দেওয়া এবং তাঁদের অবস্থানের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছিল কি না, তা জানতে মেরিনা বিচ ভিলা ইনানীর ড্রিম হলিডে রিসোর্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠান দুটির সব মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে হোটেল অর্কিড ব্লুর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের হোটেলে ২৪ জন চীনা নাগরিক ছিলেন। তাঁদের বিষয়ে চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তাঁরা চীনা নাগরিক; আমাদের হোটেলে থাকতেন। এখানে তাঁরা কোনো কাজকর্ম করতেন না। শুনেছি, অন্য কোনো হোটেলে নাকি কম্পিউটার ল্যাব করেছিলেন।

পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং রিসোর্টগুলোতে পরিচালিত কথিত অনলাইন কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ধরন উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
কক্সবাজারের রিসোর্টে ‘সাইবার ল্যাব’, জব্দ প্রায় ২ হাজার আইফোন
0:00 0:00
1.0x