সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে শাস্তি পাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিতে ফিরিয়ে আনার ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। কোনো সরকারের সময়ে বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর বা অন্য শাস্তির মুখে পড়া কর্মকর্তাদের পরবর্তী সরকার এসে ফিরিয়ে দেওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। এতে প্রশাসনে যোগ্যতা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুকূল্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক
সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২০
কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের পর বিষয়টি আবার
আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালের জুনে
রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব
ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এর
আগে গত ১ জুলাই
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে
চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার
হওয়ার অভিযোগে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া ও বরখাস্ত ১৫০
কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ
পদোন্নতি দেওয়া হয়।
অধ্যাপক
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও আগের সরকারের
সময়ে চাকরি হারানো অনেক কর্মকর্তা ফিরেছেন।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
সময়ে বরখাস্ত হওয়া ৮৫ নির্বাচন
কর্মকর্তাকেও ২০২৫ সালের ১৮
আগস্ট চাকরিতে পুনর্বহাল করে নির্বাচন কমিশন।
এদিকে
বর্তমান সরকারও বিভিন্ন খাতের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর, বরখাস্ত ও অন্যান্য শাস্তি
দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে,
সরকার বদলালে এসব সিদ্ধান্তও কি
আবার বদলে যাবে?
এনবিআরের ২০
কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ
অভ্যন্তরীণ
সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এনবিআরের ২০ কর্মকর্তার শাস্তি
মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁদের শাস্তির জন্য ক্ষমা চেয়ে
আবেদন করেছিলেন।
২০২৫
সালের জুনে এনবিআরের আন্দোলনের
কারণে রাজস্ব কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল।
আন্দোলনের একপর্যায়ে এসব কর্মকর্তাকে বদলি
করা হয়। তাঁরা প্রকাশ্যে
বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন।
পরে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে সাময়িক
বরখাস্ত এবং কাউকে বেতন
কমানোর শাস্তি দেওয়া হয়।
এখন
রাষ্ট্রপতির আদেশে সেই শাস্তি বাতিল
হয়েছে।
এর
কয়েক মাস আগেই সরকারি
কর্মচারীদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর শাস্তির
বিধান রেখে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন-২০২৬’ সংসদে
পাস হয়। এতে জনসেবার
কার্যক্রম ব্যাহত করে এমন কর্মকাণ্ডের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পুরোনো নজিরও
আছে
গত
১ জুলাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ১৫০
কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক অবসর বা ভূতাপেক্ষ
পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁদের বকেয়া
বেতন-ভাতা ও অন্যান্য
আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
এ
ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের
সাবেক উপপুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান
খানের বরখাস্তের আদেশ ১১ বছর
পর গত ৬ আগস্ট
বাতিল করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
২০২৫
সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে
বিভিন্ন কারণে চাকরি হারানো ১ হাজার ৫২২
পুলিশ সদস্যকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে নৈতিক স্খলন,
আর্থিক দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে
ফৌজদারি মামলা থাকা ব্যক্তিদের এ
প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়নি বলে
জানিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর।
একদিকে ফেরানো, অন্যদিকে সরানো
সরকার
পরিবর্তনের পর আগের সরকারের
সময়ে শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ফিরেছেন।
আবার বর্তমান সরকারও পুলিশ ও জনপ্রশাসনের অনেক
কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর ও অন্যান্য
শাস্তি দিয়েছে।
জুলাইয়ের
শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে
ডিসিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ৩২
যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পুলিশ প্রশাসনেও
বহু কর্মকর্তাকে একইভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের
প্রশ্ন, এসব সিদ্ধান্ত কতটা
প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অংশ এবং কতটা
রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত।
বিশেষজ্ঞদের মত
সাবেক
সচিব আবু আলম মোহাম্মদ
শহীদ খান বলেন, সব
সরকারের সময়ই এ ধরনের
ঘটনা ঘটেছে। দলীয় ও রাজনৈতিক
বিবেচনায় কাউকে বিদায় করা হলে সরকার
পরিবর্তনের পর তাঁদের ফিরে
আসার পথ তৈরি হয়।
আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফিরিয়ে আনলে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য
আরও শক্তিশালী হয়।
তাঁর
মতে, কোনো কর্মকর্তা অন্যায়
করলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে শাস্তি দিতে
হবে। অন্যায্যভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া হলে তা সংশোধনের
সুযোগও থাকতে হবে।
জনপ্রশাসন
বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত
সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, বিভাগীয়
মামলায় দণ্ডিত কর্মকর্তার আপিল ও রিভিউয়ের
সুযোগ রয়েছে। এরপর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল
এবং আপিল বিভাগে যাওয়ারও
সুযোগ আছে।
তাঁর
মতে, এসব প্রক্রিয়ার বাইরে
রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফিরিয়ে এনে পদে বসানো
হলে সেটি অনিয়ম। এতে
প্রশাসনের রাজনীতিকরণ আরও বাড়ে এবং
দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র
গড়ে তোলা কঠিন হয়ে
পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্যায় শাস্তি বাতিল করা ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে। তবে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় শাস্তি দেওয়া ও প্রত্যাহারের সংস্কৃতি চলতে থাকলে প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখেই থাকবে।