ঢাকা    শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা



ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা
ছবি: সংগ্রহ

নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ট্রেনেই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় গত চার বছর আট মাসে ৩ হাজার ১৬১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৭৮৬টি, ২০২৩ সালে ৬৩৯টি, ২০২৪ সালে ৬৪৫টি, ২০২৫ সালে ৮৫১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ২৫০টি মামলা হয়েছে। মামলার নথি পর্যালোচনায় গত চার বছরে ট্রেনে চুরির ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, এসব অপরাধে জড়িতদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। তারা অনেক সময় যাত্রীবেশে ট্রেনে উঠে অপরাধ করে নিকটবর্তী স্টেশনে নেমে যায়। কেউ কেউ চলন্ত ট্রেন থেকেও দ্রুত নেমে পালিয়ে যায়।

ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে ছিনতাইয়ের সময় যাত্রীদের ছুরিকাঘাত ও চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

গত ৮ মে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ওমর ফারুক শাওন আহত হন। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে ট্রেনে ওঠার পর চার ছিনতাইকারী তাঁকে পেটে ছুরিকাঘাত করে ৩ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগে ৪ মে মালিবাগ এলাকায় একটি ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ইব্রাহিম নামে এক যুবক আহত হন।

গত ৮ জুন বনানী এলাকায় মাহিদুল ইসলাম নামে এক স্কুলশিক্ষার্থীকে মারধর ও ব্লেড দিয়ে আঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। পরে তাঁকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

২০ জুন তেজগাঁও এলাকায় চট্টলা এক্সপ্রেসে তোফায়েল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কয়েকজন ছিনতাইকারী। বাধা দিলে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় তারা।

১৪ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর থেকে জামালপুরগামী ব্রহ্মপুত্র ট্রেনে সাজিদ নামে এক যুবকের কাছ থেকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আর ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হাফিজুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে টাকা ও আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার একপর্যায়ে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টিও সক্রিয়

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন রুটের ট্রেনে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টি, টানা পার্টি, ঝুলন্ত ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের তৎপরতাও রয়েছে। কেউ কেউ চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করে যাত্রীকে অজ্ঞান করে মালামাল লুটে নেয়।

রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিকুলিন চাকমা বলেন, ট্রেনে তল্লাশি ও প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ট্রেনে পুলিশের গার্ড ডিউটিও বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাবে।

অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নজরদারি কম থাকার কারণে অপরাধ বাড়ছে। রেলব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

জনবল সংকট, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

রেলওয়ে পুলিশের মোট জনবল ২ হাজার ৪৯৩ জন। ছয়টি রেলওয়ে জেলায় রয়েছে ২৪টি থানা ও ৩৩টি ফাঁড়ি। সীমিত জনবল দিয়ে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ায় অতিরিক্ত জনবল চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, স্টেশন ও চলন্ত ট্রেনে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দেহ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অপরাধী শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক স্টেশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো ট্রেনে অপরাধ ঘটলে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধী শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ট্রেনে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য নতুন করে ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম)-এ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে পুলিশ। এতে অপরাধীর বর্তমান অবস্থান ও মামলার সর্বশেষ তথ্য রাখা হবে। ফলে পুনরায় অপরাধে জড়ালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।

বিষয় : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ট্রেনে অপরাধ ছিনতাই রেলওয়ে পুলিশ যাত্রী নিরাপত্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

দৈনিক নবকাল

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ট্রেনেই বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধ। আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় গত চার বছর আট মাসে ৩ হাজার ১৬১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৭৮৬টি, ২০২৩ সালে ৬৩৯টি, ২০২৪ সালে ৬৪৫টি, ২০২৫ সালে ৮৫১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ২৫০টি মামলা হয়েছে। মামলার নথি পর্যালোচনায় গত চার বছরে ট্রেনে চুরির ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র বলছে, এসব অপরাধে জড়িতদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। তারা অনেক সময় যাত্রীবেশে ট্রেনে উঠে অপরাধ করে নিকটবর্তী স্টেশনে নেমে যায়। কেউ কেউ চলন্ত ট্রেন থেকেও দ্রুত নেমে পালিয়ে যায়।

ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে ছিনতাইয়ের সময় যাত্রীদের ছুরিকাঘাত ও চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

গত ৮ মে কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ওমর ফারুক শাওন আহত হন। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে ট্রেনে ওঠার পর চার ছিনতাইকারী তাঁকে পেটে ছুরিকাঘাত করে ৩ হাজার টাকা নিয়ে যায়। এর আগে ৪ মে মালিবাগ এলাকায় একটি ট্রেনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে ইব্রাহিম নামে এক যুবক আহত হন।

গত ৮ জুন বনানী এলাকায় মাহিদুল ইসলাম নামে এক স্কুলশিক্ষার্থীকে মারধর ও ব্লেড দিয়ে আঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। পরে তাঁকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

২০ জুন তেজগাঁও এলাকায় চট্টলা এক্সপ্রেসে তোফায়েল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কয়েকজন ছিনতাইকারী। বাধা দিলে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় তারা।

১৪ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর থেকে জামালপুরগামী ব্রহ্মপুত্র ট্রেনে সাজিদ নামে এক যুবকের কাছ থেকে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আর ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হাফিজুর রহমান (৩৫) নামে এক যুবককে টাকা ও আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার একপর্যায়ে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টিও সক্রিয়

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন রুটের ট্রেনে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি, গামছা পার্টি, টানা পার্টি, ঝুলন্ত ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের তৎপরতাও রয়েছে। কেউ কেউ চেতনানাশক স্প্রে ব্যবহার করে যাত্রীকে অজ্ঞান করে মালামাল লুটে নেয়।

রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার নিকুলিন চাকমা বলেন, ট্রেনে তল্লাশি ও প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ট্রেনে পুলিশের গার্ড ডিউটিও বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স দেখাবে।

অপরাধবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নজরদারি কম থাকার কারণে অপরাধ বাড়ছে। রেলব্যবস্থাকে প্রযুক্তিগতভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

জনবল সংকট, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি

রেলওয়ে পুলিশের মোট জনবল ২ হাজার ৪৯৩ জন। ছয়টি রেলওয়ে জেলায় রয়েছে ২৪টি থানা ও ৩৩টি ফাঁড়ি। সীমিত জনবল দিয়ে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ায় অতিরিক্ত জনবল চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, স্টেশন ও চলন্ত ট্রেনে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নজরদারি চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের দেহ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অপরাধী শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক স্টেশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো ট্রেনে অপরাধ ঘটলে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধী শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ট্রেনে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য নতুন করে ক্রিমিনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট (সিডিএম)-এ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে পুলিশ। এতে অপরাধীর বর্তমান অবস্থান ও মামলার সর্বশেষ তথ্য রাখা হবে। ফলে পুনরায় অপরাধে জড়ালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
ট্রেনে ছিনতাই-হামলা বাড়ছে, চার বছর আট মাসে ৩১৬১ মামলা
0:00 0:00
1.0x