রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে শুধু তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিলেই হবে না, বরং সেখানে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
রোববার
(৮ নভেম্বর) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে
নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক নীতি সংলাপে’ প্রধান
অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা
বলেন।
আইনমন্ত্রী
বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার
সমস্যা নয়। মিয়ানমার থেকেই
এ সংকটের সূত্রপাত হয়েছে। ফলে এর সমাধানের
মূল দায়িত্বও দেশটির। এ সংকট নিরসনে
শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয়
আলোচনার ওপর নির্ভর না
করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি
বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদেও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা
হিসেবে স্থান পেয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ বিষয়ে উদ্বেগ
প্রকাশ করেছে।
রোহিঙ্গাদের
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার
সরকারের সর্বোচ্চ বিবেচনায় রয়েছে উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান বলেন,
তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিকত্বের অধিকার
নিশ্চিত করতে হবে। জোর
করে মিয়ানমারে পাঠানো কিংবা তাদের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত
চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে নিজ
দেশে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
জাতিসংঘ
সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি
বলেন, প্রত্যাবাসনের পরও রোহিঙ্গাদের নাগরিক
হিসেবে প্রাপ্য সব অধিকার নিশ্চিত
করতে হবে। এর মধ্যে
মানবাধিকার, শিক্ষার অধিকার ও নিরাপত্তা অন্যতম।
বাংলাদেশে
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে সৃষ্ট চাপের বিষয়টিও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশ। সীমিত অর্থনৈতিক
সামর্থ্য নিয়েও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার
দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে।
এতে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ
তৈরি হয়েছে।
তিনি
আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৮২ থেকে ৯০টি
শিশুর জন্ম হচ্ছে। এ
পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত,
অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ
আরও বাড়বে।
আইনমন্ত্রী
বলেন, রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক
সমস্যা নয়; এর সঙ্গে
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার
বিষয়ও জড়িত। তাই বিষয়টি সমন্বিতভাবে
মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ সংকট মোকাবিলায়
একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে
জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটি
জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে
আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে পর্যালোচনা করবে।
রোহিঙ্গাদের
শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনায়
উত্থাপিত দাবিগুলোকে যৌক্তিক উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন,
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক বাস্তবতা ও জাতীয় নিরাপত্তার
বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। সব
দিক পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত
নেওয়া হবে।
তিনি
বলেন, অতীতে বেগম খালেদা জিয়ার
সরকার এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি
জিয়াউর রহমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যেসব
দূরদর্শী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেসব অভিজ্ঞতা কাজে
লাগিয়ে বর্তমান সরকারও স্থায়ী সমাধান চায়।
নীতি
গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি জটিল
নীতিগত ও আন্তর্জাতিক বিষয়।
এ ক্ষেত্রে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা
এবং পরামর্শ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নীতি
গবেষণা কেন্দ্রের মতো থিংক ট্যাংকগুলো
সরকারের সহযোগী হিসেবে ওয়াচডগ ও দিকনির্দেশকের ভূমিকা
পালন করতে পারে। তাদের
গঠনমূলক সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
নীতি গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির উপদেষ্টা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান। এতে বিভিন্ন গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।