ঢাকা    রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের দৃষ্টিভঙ্গি


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের দৃষ্টিভঙ্গি
ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম। ছবি: সংগ্রহ

ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম রাজকীয় দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। তবে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে ইসলামবিদ্বেষ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং মুসলমানদের প্রতি সংহতি প্রকাশের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে না দেখা এবং মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় ও মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট।

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের পাশে

২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদ পরিদর্শন করেন প্রিন্স উইলিয়াম। এর আগে একই বছরের ১৫ মার্চ আল নূর ও লিনউড মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ৫১ জন মুসল্লি নিহত হন। মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলা ছিল বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মুসল্লিদের প্রতি সংহতি জানাতে মসজিদটি পরিদর্শন করেন উইলিয়াম। সেখানে বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’।

তিনি বলেন, মসজিদ ইবাদত, বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের স্থান। এটি সমাজ ও পরিবারের জন্য আশ্রয়স্থল। অথচ সন্ত্রাসী হামলাকারী এমন একটি স্থানে ঘৃণা ও বিভেদ ছড়াতে চেয়েছিল, যে স্থান ঐক্য ও পরোপকারের প্রতীক। তবে সে উদ্দেশ্যে সফল হয়নি।

উইলিয়ামের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। তিনি বলেন, মুসলমানেরা বিশ্বকে ইসলামের প্রকৃত চেহারা দেখিয়েছেন—শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ধর্ম হিসেবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে চালানো হামলা বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের মুসলিম বন্ধুদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সংকটের সময় মুসলিম পরিবারগুলোর পাশে অন্য ধর্মের মানুষের দাঁড়ানোর ঘটনাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন।

তাঁর মতে, চরমপন্থার সব ধরনের রূপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ঘৃণার মতাদর্শ মানুষকে বিভক্ত করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা ও মানবিকতার শক্তি জয়ী হতে পারে।

পাকিস্তানের বাদশাহী মসজিদে উইলিয়াম-ক্যাথরিন

২০১৯ সালের ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর স্ত্রী প্রিন্সেস ক্যাথরিনকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান সফর করেন প্রিন্স উইলিয়াম। সফরের অংশ হিসেবে ১৮ অক্টোবর তাঁরা লাহোরের ঐতিহাসিক বাদশাহী মসজিদ পরিদর্শন করেন।

মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত এই মসজিদ উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী স্থাপত্য নিদর্শন।

মসজিদে তাঁদের স্বাগত জানান ইতিহাসবিদ ও লেখক ফকির সৈয়দ আয়াজউদ্দিন এবং মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল খাবির আজাদ। তাঁরা রাজদম্পতিকে মসজিদের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে জানান।

এ সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্তধর্মীয় আলোচনায়ও অংশ নেন তাঁরা। মসজিদের ইমাম পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং সেগুলোর ইংরেজি অর্থ ব্যাখ্যা করেন।

উল্লেখ্য, উইলিয়ামের বাবা রাজা চার্লস ২০০৬ সালে এবং মা প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯৬ সালে একই মসজিদ পরিদর্শন করেছিলেন। মসজিদের খতিবের সঙ্গে আলোচনায় উইলিয়াম তাঁদের পরিবারের সঙ্গে মসজিদটির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন।

আল-আকসা মসজিদেও গিয়েছিলেন

এর আগে ২০১৮ সালের ২৮ জুন ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন প্রিন্স উইলিয়াম। মধ্যপ্রাচ্য সফরের শেষ দিনে তাঁর এই পরিদর্শন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।

১৯৪৮ সালের পর ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো সদস্যের ওই স্থানে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর ছিল এটি।

জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াক্‌ফ বিভাগের পরিচালক শেখ আজ্জাম আল-খতিব তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় জর্ডান পরিচালিত ধর্মীয় ট্রাস্টের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

উইলিয়াম আল-আকসা মসজিদ এবং এর প্রাঙ্গণে অবস্থিত সোনালি গম্বুজের কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক পরিদর্শন করেন। মুসলমানদের কাছে আল-হারাম আল-শরিফ নামে পরিচিত এই প্রাঙ্গণ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।

মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাও হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইসলামবিদ্বেষ ও চরমপন্থা নিয়ে অবস্থান

প্রিন্স উইলিয়ামের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ধর্মীয় চরমপন্থার বিরোধিতা করার পাশাপাশি মুসলমানদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতারও বিরোধিতা করেছেন।

ক্রাইস্টচার্চের বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চার্লসটনের গির্জায় হামলা, পিটসবার্গের সিনাগগে হত্যাকাণ্ড, লন্ডনের ফিনসবারি পার্কে হামলা এবং শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

এসব উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সহিংস চরমপন্থা কোনো একটি ধর্মের সমস্যা নয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও উগ্র মতাদর্শ থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, কোনো অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পুরো একটি সম্প্রদায়কে দায়ী করা উচিত নয়। এতে সামাজিক বিভাজন বাড়ে এবং উগ্রপন্থীরা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ পায়।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহাবস্থানের বার্তা

প্রিন্স উইলিয়ামের বক্তব্যে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, হিজাব ও আজানের প্রসঙ্গও এসেছে। তিনি মনে করেন, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। কোনো সম্প্রদায় হামলার শিকার হলে তাদের ধর্মীয় পরিচয় আড়াল করার পরিবর্তে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে তাঁর এসব বক্তব্য থেকে ব্রিটেনের অভিবাসন, ধর্মীয় পোশাক কিংবা ধর্মীয় শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিটি নীতির প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন অনুমান করার সুযোগ নেই। তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল আক্রান্ত সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা।

বহুধর্মীয় ব্রিটেনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখা রাজপরিবারের সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ। সে বিবেচনায় ক্রাইস্টচার্চে সংহতি প্রকাশ এবং পাকিস্তানের বাদশাহী মসজিদ ও আল-আকসা পরিদর্শনের ঘটনাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের প্রকাশ্য বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক সংহতি এবং আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল শিক্ষা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া।

বিষয় : প্রিন্স উইলিয়াম ব্রিটিশ রাজপরিবার ইসলাম মুসলিম সম্প্রদায়

দৈনিক নবকাল

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম রাজকীয় দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। তবে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে ইসলামবিদ্বেষ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং মুসলমানদের প্রতি সংহতি প্রকাশের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে না দেখা এবং মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় ও মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট।

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের পাশে

২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদ পরিদর্শন করেন প্রিন্স উইলিয়াম। এর আগে একই বছরের ১৫ মার্চ আল নূর ও লিনউড মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ৫১ জন মুসল্লি নিহত হন। মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলা ছিল বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মুসল্লিদের প্রতি সংহতি জানাতে মসজিদটি পরিদর্শন করেন উইলিয়াম। সেখানে বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’।

তিনি বলেন, মসজিদ ইবাদত, বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের স্থান। এটি সমাজ ও পরিবারের জন্য আশ্রয়স্থল। অথচ সন্ত্রাসী হামলাকারী এমন একটি স্থানে ঘৃণা ও বিভেদ ছড়াতে চেয়েছিল, যে স্থান ঐক্য ও পরোপকারের প্রতীক। তবে সে উদ্দেশ্যে সফল হয়নি।

উইলিয়ামের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। তিনি বলেন, মুসলমানেরা বিশ্বকে ইসলামের প্রকৃত চেহারা দেখিয়েছেন—শান্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ধর্ম হিসেবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে চালানো হামলা বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের মুসলিম বন্ধুদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। সংকটের সময় মুসলিম পরিবারগুলোর পাশে অন্য ধর্মের মানুষের দাঁড়ানোর ঘটনাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন।

তাঁর মতে, চরমপন্থার সব ধরনের রূপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ঘৃণার মতাদর্শ মানুষকে বিভক্ত করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা ও মানবিকতার শক্তি জয়ী হতে পারে।

পাকিস্তানের বাদশাহী মসজিদে উইলিয়াম-ক্যাথরিন

২০১৯ সালের ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর স্ত্রী প্রিন্সেস ক্যাথরিনকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান সফর করেন প্রিন্স উইলিয়াম। সফরের অংশ হিসেবে ১৮ অক্টোবর তাঁরা লাহোরের ঐতিহাসিক বাদশাহী মসজিদ পরিদর্শন করেন।

মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত এই মসজিদ উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী স্থাপত্য নিদর্শন।

মসজিদে তাঁদের স্বাগত জানান ইতিহাসবিদ ও লেখক ফকির সৈয়দ আয়াজউদ্দিন এবং মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল খাবির আজাদ। তাঁরা রাজদম্পতিকে মসজিদের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে জানান।

এ সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্তধর্মীয় আলোচনায়ও অংশ নেন তাঁরা। মসজিদের ইমাম পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং সেগুলোর ইংরেজি অর্থ ব্যাখ্যা করেন।

উল্লেখ্য, উইলিয়ামের বাবা রাজা চার্লস ২০০৬ সালে এবং মা প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানা ১৯৯৬ সালে একই মসজিদ পরিদর্শন করেছিলেন। মসজিদের খতিবের সঙ্গে আলোচনায় উইলিয়াম তাঁদের পরিবারের সঙ্গে মসজিদটির দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন।

আল-আকসা মসজিদেও গিয়েছিলেন

এর আগে ২০১৮ সালের ২৮ জুন ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন প্রিন্স উইলিয়াম। মধ্যপ্রাচ্য সফরের শেষ দিনে তাঁর এই পরিদর্শন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।

১৯৪৮ সালের পর ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো সদস্যের ওই স্থানে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর ছিল এটি।

জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াক্‌ফ বিভাগের পরিচালক শেখ আজ্জাম আল-খতিব তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় জর্ডান পরিচালিত ধর্মীয় ট্রাস্টের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

উইলিয়াম আল-আকসা মসজিদ এবং এর প্রাঙ্গণে অবস্থিত সোনালি গম্বুজের কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক পরিদর্শন করেন। মুসলমানদের কাছে আল-হারাম আল-শরিফ নামে পরিচিত এই প্রাঙ্গণ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।

মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাও হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইসলামবিদ্বেষ ও চরমপন্থা নিয়ে অবস্থান

প্রিন্স উইলিয়ামের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ধর্মীয় চরমপন্থার বিরোধিতা করার পাশাপাশি মুসলমানদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতারও বিরোধিতা করেছেন।

ক্রাইস্টচার্চের বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চার্লসটনের গির্জায় হামলা, পিটসবার্গের সিনাগগে হত্যাকাণ্ড, লন্ডনের ফিনসবারি পার্কে হামলা এবং শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

এসব উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সহিংস চরমপন্থা কোনো একটি ধর্মের সমস্যা নয়। বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও উগ্র মতাদর্শ থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, কোনো অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পুরো একটি সম্প্রদায়কে দায়ী করা উচিত নয়। এতে সামাজিক বিভাজন বাড়ে এবং উগ্রপন্থীরা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ পায়।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহাবস্থানের বার্তা

প্রিন্স উইলিয়ামের বক্তব্যে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, হিজাব ও আজানের প্রসঙ্গও এসেছে। তিনি মনে করেন, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। কোনো সম্প্রদায় হামলার শিকার হলে তাদের ধর্মীয় পরিচয় আড়াল করার পরিবর্তে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তবে তাঁর এসব বক্তব্য থেকে ব্রিটেনের অভিবাসন, ধর্মীয় পোশাক কিংবা ধর্মীয় শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিটি নীতির প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন অনুমান করার সুযোগ নেই। তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল আক্রান্ত সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা।

বহুধর্মীয় ব্রিটেনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখা রাজপরিবারের সামাজিক দায়িত্বেরও অংশ। সে বিবেচনায় ক্রাইস্টচার্চে সংহতি প্রকাশ এবং পাকিস্তানের বাদশাহী মসজিদ ও আল-আকসা পরিদর্শনের ঘটনাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ।

সব মিলিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের প্রকাশ্য বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মানবিক সংহতি এবং আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল শিক্ষা ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে প্রিন্স উইলিয়ামের দৃষ্টিভঙ্গি
0:00 0:00
1.0x