ঢাকা    শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল
ছবি: সংগ্রহ

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বাস্তব রাজনীতিকদের দিয়ে কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেখিয়ে তৈরি এসব বিজ্ঞাপন অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বলে বোঝা গেলেও ভোটারদের মনোভাব গঠনে প্রভাব ফেলছে। এ নিয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, পক্ষপাত ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিজ্ঞাপনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এমন সব বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে যা ঘটেনি। বিজ্ঞাপনগুলোর অনেকগুলোই যে কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা স্পষ্ট। তবু ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।

নিউইয়র্কের গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের একটি বিজ্ঞাপনে শহরটির মেয়র জোহরান মামদানি ও গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে একসঙ্গে বাগান করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন তাঁরা বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনায় একমত। আরেকটি বিজ্ঞাপনে হোকুলকে বলতে শোনা যায়, তিনি টোল ও যাতায়াতের ভাড়া বাড়াতে চান, যাতে মানুষ গাড়ি বা পাতালরেলে চলাচলের সামর্থ্য হারায়।

তবে এসব বিজ্ঞাপনে হোকুল কিংবা মামদানি কেউই অংশ নেননি। এআই ব্যবহার করে তাঁদের কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।

ভুয়া বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি ডলারের ব্যয়

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিনীতি কেন্দ্রের পরিচালক স্কট বাবওয়া ব্রেনেন মনে করেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে এমন বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি। তিনি এ ধরনের প্রচারকে বলেছেন ‘স্লপাগান্ডা’। নিম্নমানের এআই-নির্মিত উপাদান ও প্রচারণামূলক অপতথ্যের সমন্বয়ে শব্দটি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল স্লপাগান্ডা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের সহলেখক তিনি।

নির্বাচনী বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী নির্দলীয় সংস্থা ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী মৌসুমে রাজনৈতিক প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা এআই ব্যবহার করে ১৬৪টির বেশি বিজ্ঞাপন তৈরিতে আট কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। এসব বিজ্ঞাপনের প্রায় ৮০ শতাংশের পেছনে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।

ব্লেকম্যান অবশ্য তাঁর বিজ্ঞাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো এআই দিয়ে তৈরি—এ কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞাপনের শুরুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এ বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেখানো হয়। তাঁর মতে, মার্কিন রাজনীতিতে ব্যঙ্গ ও পরিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপন সেই ঐতিহ্যেরই অংশ।

তবে ব্রেনেনের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য সব সময় সরাসরি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নয়। বরং কোনো প্রার্থীর চরিত্র, আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ভোটারদের মনে একটি ধারণা তৈরি করাও এর লক্ষ্য। এসব বিজ্ঞাপন তথ্যগত সত্যের চেয়ে ‘গভীরতর সত্য’ তুলে ধরার দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে তা ভোটারদের আস্থা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।

কাউকে অবাঞ্ছিত অতিথি, কাউকে সুপারহিরো

এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের নানা অস্বাভাবিক ও ব্যঙ্গাত্মক ভূমিকায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওহাইওতে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউনকে একটি পার্টিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এমন এক অতিথি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাঁর উপস্থিতি আর কেউ পছন্দ করছে না।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ চলচ্চিত্রের মারিয়া চরিত্রের মতো নীল পোশাকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে সুপারহিরোর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের বিজ্ঞাপন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে ব্যঙ্গ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য সিনেটর স্কট উইনারের একটি এআই-চালিত চ্যাটবট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চ্যাটবটটি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যান সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছিল।

প্রায় পাঁচ হাজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চ্যাটবটটিতে চ্যানের বিরুদ্ধে শহরে আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যঙ্গ করা হয়। পাশাপাশি তাঁর উচ্চারণ ও নাগরিকত্ব নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। এতে পক্ষপাত ও বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে চ্যাটবটটি সরিয়ে নেন উইনার। তিনি স্বীকার করেন, উদ্যোগটি নতুনত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও মানবাধিকার গবেষণাকেন্দ্র স্টারলিং ল্যাবের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অ্যাডাম রোজ মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত নয়। কারণ, এআইয়ের কিছু ব্যবহার কেবল বিজ্ঞাপনের রং বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের মতো সাধারণ সম্পাদনার মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।

তবে তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহার করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত প্রার্থীদেরই নিতে হয়। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেয় এবং ভোটারদের কাছে তাঁদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। উইনারের চ্যাটবটের উদাহরণ টেনে রোজ বলেন, ওই উদ্যোগ ভোটারদের কাছে উইনারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি বার্তা দিয়েছে।

এআই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় আইন নেই

যুক্তরাষ্ট্রে এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। তবে ৩১টি অঙ্গরাজ্য এ ধরনের বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করার বিধান রেখে নিজস্ব আইন করেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের এআই নীতি বিভাগের পরিচালক ইলানা বেলার বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অঙ্গরাজ্যগুলো এ ধরনের আইন করছে। তবে তাঁর মতে, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োজন।

এআই বিজ্ঞাপনের ব্যবহার নিয়ে রোজ ও বেলারের অবস্থানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। রোজ মনে করেন, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, বেলার জোর দেন বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি ভোটারদের কাছে সহজে বোধগম্য করে তোলার ওপর।

সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনে উইনারের প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যানের মুখপাত্র ইয়ান ক্রেগার মনে করেন, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

ক্রেগারের ভাষ্য, এআইয়ের বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে এর ব্যয় যেন শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। তাঁর অভিযোগ, চ্যান শ্রমজীবী পরিবারগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর উইনার এআই কোম্পানিগুলোর পক্ষে।

উইনার গত বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রস্তাবিত বিধানে বড় আকারের এআই মডেল থেকে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনা প্রকাশ করতে হতো। পরে তুলনামূলক শিথিল একটি সংস্করণ আইনে পরিণত হয়। এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে উইনারের দপ্তর সাড়া দেয়নি।

খাবারের মোড়কের মতো স্পষ্ট লেবেল চান বিশেষজ্ঞরা

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ পর্যায় ও পরবর্তী সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানোর পক্ষে মত দিয়েছেন পাবলিক সিটিজেনের ইলানা বেলার।

তাঁর মতে, খাবারের মোড়কে যেমন উপাদানের তথ্য সহজে বোঝা যায়, তেমনি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেও এআই ব্যবহারের লেবেল হতে হবে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য। এতে ভোটারেরা বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিশেষ করে তরুণ ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন বেলার। তাঁর মতে, মানুষকে এসব বিজ্ঞাপনের লেবেল শনাক্ত করতে শেখাতে হবে।

নিউইয়র্কে ব্লেকম্যানের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বোর্ডে অভিযোগ করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো তথ্য প্রকাশের বিধি লঙ্ঘন করেছে এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। তবে ব্লেকম্যানের বক্তব্য, মানুষ এসব বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছে এবং ব্যঙ্গ পছন্দ করছে।

ব্রেনেনের মতে, রাজনৈতিক প্রার্থীরা জানেন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে নির্বাচনী প্রচারে সুবিধা পাওয়া যায়। এ কারণেই এআই দিয়ে তৈরি এমন বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করবেন না।

বেলারের ভাষ্য, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাবও দেখা যাচ্ছে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা রাজনৈতিক প্রচারে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা ও কল্পিত দৃশ্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের তথ্য কতটা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে এবং ভোটারেরা সেই তথ্য কতটা বুঝতে পারছেন সমধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ প্রশ্নগুলোই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিষয় : যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই বিজ্ঞাপন রাজনৈতিক প্রচার

দৈনিক নবকাল

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল

প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বাস্তব রাজনীতিকদের দিয়ে কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেখিয়ে তৈরি এসব বিজ্ঞাপন অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বলে বোঝা গেলেও ভোটারদের মনোভাব গঠনে প্রভাব ফেলছে। এ নিয়ে উঠেছে স্বচ্ছতা, পক্ষপাত ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিজ্ঞাপনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এমন সব বক্তব্য দিতে বা কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে যা ঘটেনি। বিজ্ঞাপনগুলোর অনেকগুলোই যে কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা স্পষ্ট। তবু ব্যঙ্গ, হাস্যরস ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।

নিউইয়র্কের গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী ব্রুস ব্লেকম্যানের একটি বিজ্ঞাপনে শহরটির মেয়র জোহরান মামদানি ও গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে একসঙ্গে বাগান করতে দেখা যায়। বিজ্ঞাপনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন তাঁরা বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনায় একমত। আরেকটি বিজ্ঞাপনে হোকুলকে বলতে শোনা যায়, তিনি টোল ও যাতায়াতের ভাড়া বাড়াতে চান, যাতে মানুষ গাড়ি বা পাতালরেলে চলাচলের সামর্থ্য হারায়।

তবে এসব বিজ্ঞাপনে হোকুল কিংবা মামদানি কেউই অংশ নেননি। এআই ব্যবহার করে তাঁদের কাল্পনিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।

ভুয়া বিজ্ঞাপনে কোটি কোটি ডলারের ব্যয়

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিনীতি কেন্দ্রের পরিচালক স্কট বাবওয়া ব্রেনেন মনে করেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারে এমন বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি। তিনি এ ধরনের প্রচারকে বলেছেন ‘স্লপাগান্ডা’। নিম্নমানের এআই-নির্মিত উপাদান ও প্রচারণামূলক অপতথ্যের সমন্বয়ে শব্দটি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল স্লপাগান্ডা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের সহলেখক তিনি।

নির্বাচনী বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী নির্দলীয় সংস্থা ওয়েসলিয়ান মিডিয়া প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনী মৌসুমে রাজনৈতিক প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা এআই ব্যবহার করে ১৬৪টির বেশি বিজ্ঞাপন তৈরিতে আট কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। এসব বিজ্ঞাপনের প্রায় ৮০ শতাংশের পেছনে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা।

ব্লেকম্যান অবশ্য তাঁর বিজ্ঞাপনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো এআই দিয়ে তৈরি—এ কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞাপনের শুরুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য এ বিষয়ে সতর্কবার্তাও দেখানো হয়। তাঁর মতে, মার্কিন রাজনীতিতে ব্যঙ্গ ও পরিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপন সেই ঐতিহ্যেরই অংশ।

তবে ব্রেনেনের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য সব সময় সরাসরি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নয়। বরং কোনো প্রার্থীর চরিত্র, আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ভোটারদের মনে একটি ধারণা তৈরি করাও এর লক্ষ্য। এসব বিজ্ঞাপন তথ্যগত সত্যের চেয়ে ‘গভীরতর সত্য’ তুলে ধরার দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে তা ভোটারদের আস্থা ও রাজনৈতিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।

কাউকে অবাঞ্ছিত অতিথি, কাউকে সুপারহিরো

এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের নানা অস্বাভাবিক ও ব্যঙ্গাত্মক ভূমিকায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। ওহাইওতে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউনকে একটি পার্টিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা এমন এক অতিথি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাঁর উপস্থিতি আর কেউ পছন্দ করছে না।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ চলচ্চিত্রের মারিয়া চরিত্রের মতো নীল পোশাকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে, মিশিগানে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সকে সুপারহিরোর ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে এ ধরনের বিজ্ঞাপন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে ব্যঙ্গ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য সিনেটর স্কট উইনারের একটি এআই-চালিত চ্যাটবট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চ্যাটবটটি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যান সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য চালু করা হয়েছিল।

প্রায় পাঁচ হাজার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া চ্যাটবটটিতে চ্যানের বিরুদ্ধে শহরে আবাসনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ব্যঙ্গ করা হয়। পাশাপাশি তাঁর উচ্চারণ ও নাগরিকত্ব নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। এতে পক্ষপাত ও বিদ্বেষমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে চ্যাটবটটি সরিয়ে নেন উইনার। তিনি স্বীকার করেন, উদ্যোগটি নতুনত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও মানবাধিকার গবেষণাকেন্দ্র স্টারলিং ল্যাবের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অ্যাডাম রোজ মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত নয়। কারণ, এআইয়ের কিছু ব্যবহার কেবল বিজ্ঞাপনের রং বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের মতো সাধারণ সম্পাদনার মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।

তবে তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহার করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত প্রার্থীদেরই নিতে হয়। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেয় এবং ভোটারদের কাছে তাঁদের সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। উইনারের চ্যাটবটের উদাহরণ টেনে রোজ বলেন, ওই উদ্যোগ ভোটারদের কাছে উইনারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি বার্তা দিয়েছে।

এআই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় আইন নেই

যুক্তরাষ্ট্রে এআই দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। তবে ৩১টি অঙ্গরাজ্য এ ধরনের বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি প্রকাশ করার বিধান রেখে নিজস্ব আইন করেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ভোক্তা অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের এআই নীতি বিভাগের পরিচালক ইলানা বেলার বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই অঙ্গরাজ্যগুলো এ ধরনের আইন করছে। তবে তাঁর মতে, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োজন।

এআই বিজ্ঞাপনের ব্যবহার নিয়ে রোজ ও বেলারের অবস্থানে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। রোজ মনে করেন, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কীভাবে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে, বেলার জোর দেন বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি ভোটারদের কাছে সহজে বোধগম্য করে তোলার ওপর।

সান ফ্রান্সিসকোতে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনে উইনারের প্রতিদ্বন্দ্বী কনি চ্যানের মুখপাত্র ইয়ান ক্রেগার মনে করেন, এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

ক্রেগারের ভাষ্য, এআইয়ের বিকাশে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে এর ব্যয় যেন শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়। তাঁর অভিযোগ, চ্যান শ্রমজীবী পরিবারগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর উইনার এআই কোম্পানিগুলোর পক্ষে।

উইনার গত বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রস্তাবিত বিধানে বড় আকারের এআই মডেল থেকে তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘটনা প্রকাশ করতে হতো। পরে তুলনামূলক শিথিল একটি সংস্করণ আইনে পরিণত হয়। এ বিষয়ে আল-জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে উইনারের দপ্তর সাড়া দেয়নি।

খাবারের মোড়কের মতো স্পষ্ট লেবেল চান বিশেষজ্ঞরা

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ পর্যায় ও পরবর্তী সময়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানোর পক্ষে মত দিয়েছেন পাবলিক সিটিজেনের ইলানা বেলার।

তাঁর মতে, খাবারের মোড়কে যেমন উপাদানের তথ্য সহজে বোঝা যায়, তেমনি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেও এআই ব্যবহারের লেবেল হতে হবে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য। এতে ভোটারেরা বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিশেষ করে তরুণ ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন বেলার। তাঁর মতে, মানুষকে এসব বিজ্ঞাপনের লেবেল শনাক্ত করতে শেখাতে হবে।

নিউইয়র্কে ব্লেকম্যানের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বোর্ডে অভিযোগ করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির দাবি, বিজ্ঞাপনগুলো তথ্য প্রকাশের বিধি লঙ্ঘন করেছে এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। তবে ব্লেকম্যানের বক্তব্য, মানুষ এসব বিজ্ঞাপনকে হাস্যরসাত্মক হিসেবে দেখছে এবং ব্যঙ্গ পছন্দ করছে।

ব্রেনেনের মতে, রাজনৈতিক প্রার্থীরা জানেন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে নির্বাচনী প্রচারে সুবিধা পাওয়া যায়। এ কারণেই এআই দিয়ে তৈরি এমন বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করবেন না।

বেলারের ভাষ্য, এআই দিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রার্থীদের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাবও দেখা যাচ্ছে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতা রাজনৈতিক প্রচারে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর মাধ্যমে বাস্তব ঘটনা ও কল্পিত দৃশ্যের সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিজ্ঞাপনে এআই ব্যবহারের তথ্য কতটা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে এবং ভোটারেরা সেই তথ্য কতটা বুঝতে পারছেন সমধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এ প্রশ্নগুলোই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন, ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন কৌশল
0:00 0:00
1.0x