জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে দেশের পরিবহন, বাজার ও শিল্প খাতে। বেড়েছে বাস, ট্রাক ও লরির ভাড়া। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এতে চাপে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যাত্রী ও শিল্পোদ্যোক্তারা।
গতকাল মঙ্গলবার
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহনের চালক-হেলপার, ক্রেতা-বিক্রেতা ও নিম্ন আয়ের
মানুষের সঙ্গে কথা বলে ক্ষোভ
ও হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর
ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে
পরিবহনশ্রমিকদের বাগ্বিতণ্ডাও বাড়ছে।
বাসভাড়া বেড়েছে, পথে
পথে
বিতর্ক
জ্বালানি তেলের
মূল্যবৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া
কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর
সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের
বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম
মহানগরে বড় বাসের ভাড়া
কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩
পয়সা থেকে বেড়ে ২
টাকা ৭০ পয়সা এবং
মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা
৪২ পয়সা থেকে ২
টাকা ৫৯ পয়সা হয়েছে।
দূরপাল্লার ৫২
আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া
২ টাকা ২৩ পয়সা
থেকে বেড়ে ২ টাকা
৪০ পয়সা নির্ধারণ করা
হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য,
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীপ্রতি ৫
থেকে ২০ টাকা এবং
ঢাকার বাইরে দূরত্ব ও বাসভেদে ৫০
থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত
অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
ফার্মগেট থেকে
মালিবাগ পর্যন্ত আগে ১০ টাকা
ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ১৫
টাকা নেওয়া হচ্ছে। ফার্মগেট থেকে সাইনবোর্ড রুটেও
নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায়ের
অভিযোগ রয়েছে।
কাঁচাবাজারে বাড়তি
খরচ
জ্বালানির দাম
বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারেও। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ৫
থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে।
৬০–৭০ টাকার সবজি
এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০–৮০ টাকায়।
আলু ও পেঁপের দামও
কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়েছে।
কিছু সবজির দাম ছাড়িয়েছে ১০০
টাকা।
পাইকারি বিক্রেতাদের
দাবি, বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজি সংগ্রহে
পরিবহন খরচ দূরত্ব ও
ট্রাকভেদে ২ হাজার থেকে
৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চাল, ডাল, চিনি ও
ভোজ্যতেলের বাড়তি দামের মধ্যে নতুন করে পরিবহন
ব্যয় বৃদ্ধি ক্রেতাদের ওপর চাপ আরও
বাড়িয়েছে।
কারওয়ান বাজারের
টং দোকানি বাবলু শেখ বলেন, ‘তেলের
দাম বাইড়া যাওয়ায় গত দুইদিন ধইরা
বিক্রি অনেক কোইমা গ্যাছে।
মানুষ মনে হয় চা
খাওয়াও ছাইড়া দিছে!’
ট্রাকভাড়া বেড়েছে, পণ্য
পরিবহনে সংকট
জ্বালানি তেলের
মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে ট্রাকভাড়াও
বেড়েছে। দূরত্ব, পণ্য ও ট্রাকের
আকারভেদে প্রতি ট্রিপে ২ হাজার থেকে
৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া
বাড়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনাপোল থেকে
ঢাকায় আগে ট্রাকভাড়া ছিল
২০–২১ হাজার টাকা।
গতকাল তা বেড়ে ২৫–২৬ হাজার টাকা
হয়েছে। ভাড়া বৃদ্ধি ও
ট্রাকসংকটের কারণে বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে আমদানি করা
পণ্য খালাসে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিদিন ৪০০–৬০০ ট্রাক
পণ্য লোড-আনলোড হলেও
এখন তা প্রায় অর্ধেকে
নেমেছে।
রাইড
শেয়ারকারীদের আয়
কমছে
পেট্রোল ও
অকটেনের দাম বাড়ায় বিপাকে
পড়েছেন মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করা
কর্মীরা। তাঁদের দাবি, জ্বালানির খরচ বাড়লেও যাত্রী
পরিবহনের ভাড়া সে অনুযায়ী
বাড়েনি। যাত্রীসংখ্যা কম থাকায় অনেক
সময় একটি ট্রিপের জন্য
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
করতে হয়।
রাইড শেয়ারার
আলাউদ্দিন বলেন, সব খরচ বাদ
দিয়ে দিনে ৮০০–৯০০
টাকা আয় করাও এখন
কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিল্পোৎপাদন ও কর্মসংস্থানে শঙ্কা
গার্মেন্টস, টেক্সটাইল,
সিমেন্ট, স্টিল ও সিরামিকসহ বিভিন্ন
শিল্পে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়
বাড়ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে
উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে
পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি
শিল্পোৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক
প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে জ্বালানি
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা
করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ
থাকায় ভবিষ্যতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি
জ্বালানি তেলের
দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে গবেষণা ও নীতি সংস্থা
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড
ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী
পরিচালক মোহাম্মদ আদিল খান এক
বিবৃতিতে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও রাজস্ব চাপের
অজুহাতে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার
জন্য ক্ষতিকর। তিনি অবিলম্বে সিদ্ধান্ত
প্রত্যাহারের দাবি জানান।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, এমনিতেই নিম্ন আয়ের মানুষ তীব্র
অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। নতুন
করে জ্বালানির দাম বাড়ায় তাঁদের
পরিবারের ব্যয় আরও বাড়বে।
এতে মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও বৈষম্য বৃদ্ধির
ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, দারিদ্র্য ও
জনদুর্ভোগ কমাতে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দিকে
নজর দেওয়া জরুরি।