পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পিয়ন পদে নিয়োগ নিয়ে তদবিরের অভিযোগ ঘিরে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর বদলি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়া এক চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগের সুপারিশ উপেক্ষা করায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের অসন্তোষের মুখে তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিমন্ত্রী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিভাগীয় কমিশনারও বদলিকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে উল্লেখ করেছেন।
বিসিএস ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা
ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে
গত মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু
পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
সম্প্রতি তিনি যুগ্ম সচিব
হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ২৪
সেপ্টেম্বর তাঁকে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক হিসেবে
নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
প্রক্সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিযোগ
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
সূত্রে জানা যায়, জেলা
রাজস্ব প্রশাসনে অফিস সহায়কের ১০টি
শূন্য পদে নিয়োগের জন্য
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ২৬
সেপ্টেম্বর। ওই পরীক্ষায় অংশ
নিতে আসা জহিরুল ইসলাম
লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন বলে মামলার এজাহারে
উল্লেখ করা হয়েছে।
মৌখিক পরীক্ষার সময় বোর্ডের সদস্যরা
তাঁকে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন করেন। কিন্তু তিনি সেগুলোর উত্তর
দিতে ব্যর্থ হন। এতে সন্দেহ
তৈরি হলে তাঁর লিখিত
পরীক্ষার উত্তরপত্র ও হাতের লেখা
যাচাই করা হয়। তখন
হাতের লেখায় অসংগতি পাওয়া যায় বলে এজাহারে
উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জহিরুল ইসলাম প্রক্সি পরীক্ষার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, গত
২৫ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সরকারি কলেজের বাণিজ্য ভবনে অনুষ্ঠিত লিখিত
পরীক্ষায় তাঁর পরিবর্তে সাখাওয়াত
নামের এক ব্যক্তি অংশ
নেন। এ ঘটনায় গত
২৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সদর থানায় মামলা
করেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত
সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর
রাকিবুল ইসলাম। পরে পুলিশ জহিরুল
ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।
প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদবিরের অভিযোগ
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের
কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, জহিরুল ইসলাম ছিলেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের পছন্দের
প্রার্থী। তাঁকে চাকরি দেওয়ার জন্য প্রতিমন্ত্রী জেলা
প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করেছিলেন।
কিন্তু প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগ সামনে আসার পর জেলা
প্রশাসক তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
নেওয়ায় প্রতিমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। এরপর ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা
হয় এবং পরবর্তী সময়ে
জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়
বলে তাঁদের দাবি।
তবে প্রতিমন্ত্রী নুরুল
হক নুর এ অভিযোগ
অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জেলা
প্রশাসকের আচরণগত সমস্যা রয়েছে এবং তিনি ঊর্ধ্বতন
ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান করেন না। প্রতিমন্ত্রী
হিসেবে তিনি পটুয়াখালী সফরে
গেলে জেলা প্রশাসক তাঁর
অনুষ্ঠানে যোগ দেন না,
অথচ পুলিশ সুপার সেখানে উপস্থিত হন বলে দাবি
করেন তিনি।
নুরুল হক নুর আরও
বলেন, কয়েক দিন আগে
সরকারি সফরে পটুয়াখালী গেলে
জেলা প্রশাসক একটি সেমিনারে যোগ
দেওয়ার কথা বলে কুয়াকাটা
চলে যান। তাঁর ভাষ্য,
জেলা প্রশাসকের অসদাচরণের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে
জানিয়েছেন। তবে পিয়ন নিয়োগে
তদবিরের অভিযোগ সঠিক নয় বলে
দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
বদলিকে নিয়মিত প্রক্রিয়া বলছে বিভাগীয় প্রশাসন
প্রতিমন্ত্রীর অসন্তোষের কারণে জেলা প্রশাসককে বদলি
করা হয়েছে কি না, জানতে
চাইলে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন,
জেলা প্রশাসকের পদোন্নতি হয়েছে এবং তাঁর বদলি
জনপ্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। এ ঘটনায়
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের কোনো
ভূমিকা রয়েছে কি না, তা
তাঁর জানা নেই বলে
জানান তিনি।
অন্যদিকে, বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ শহীদ
হোসেন চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে
চাননি।
টিআইবির চোখে অনৈতিক চাপের অভিযোগ উদ্বেগজনক
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
একই দিনে কয়েকজন জেলা
প্রশাসককে বদলি করায় বিষয়টি
আপাতদৃষ্টিতে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলে মনে হতে
পারে। তবে পটুয়াখালীর জেলা
প্রশাসকের ক্ষেত্রে একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে
অনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ
ওঠায় বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য।
তিনি বলেন, প্রক্সি
পরীক্ষার মতো প্রতারণার আশ্রয়
নেওয়া কোনো প্রার্থীর পক্ষে
জনপ্রতিনিধির চাকরির সুপারিশ করা অনৈতিক এবং
তা প্রতারণায় সহায়তা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের
দৃষ্টান্ত হতে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও
বলেন, ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে
আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে যদি একজন সরকারি
কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়ে
থাকে, তাহলে তা সরকারের ৩১
দফা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের
সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
তবে জেলা প্রশাসকের
বদলির সঙ্গে নিয়োগে তদবিরের কোনো যোগসূত্র রয়েছে
কি না, তা স্বাধীনভাবে
নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া
যায়নি। ফলে এ ঘটনায়
প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং
বদলির প্রশাসনিক ব্যাখ্যা—দুই দিকই আলোচনায়
রয়েছে।