ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে ৪১ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ। মধ্য দিল্লির একটি বড় এলাকায় বন্ধ রয়েছে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাতিল করা হয়েছে ২৫৪টি ট্রেন।
বিক্ষোভের অনুমতি
না
দিলেও
সিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা দিল্লিতে প্রবেশ
করে
জমায়েতের চেষ্টা
করতে
পারেন
বলে
আশঙ্কা
করছে
প্রশাসন। এ
কারণে
রাজধানীর প্রবেশপথ, রেলস্টেশন, বাস
টার্মিনাল ও
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বাড়ানো
হয়েছে
নজরদারি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবেশী উত্তর
প্রদেশেও সতর্কতা জারি
করা
হয়েছে।
শুক্রবার রাত
থেকেই
দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার
করা
হয়।
যন্তর
মন্তরের চারপাশে বসানো
হয়েছে
একাধিক
স্তরের
ব্যারিকেড। স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি চালানো
হয়েছে
মহড়া।
৪১ হাজারের বেশি
নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন
দিল্লি পুলিশের ১৫
হাজারের বেশি
সদস্যের সঙ্গে
কেন্দ্রীয় বাহিনীর অন্তত
২৬
হাজার
সদস্য
দায়িত্ব পালন
করছেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করতে
নয়াদিল্লিকে ২০টি
জোনে
ভাগ
করা
হয়েছে।
প্রতিটি জোনের
দায়িত্বে রয়েছেন
উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন
কর্মকর্তা।
আন্দোলনকারীদের মিছিল
আসতে
পারে—এমন ৩৭টি স্থান
চিহ্নিত করে
ব্যারিকেড বসানো
হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার
করতে
হরিয়ানা ও
উত্তর
প্রদেশ
থেকেও
পাঁচ
হাজার
নিরাপত্তাকর্মী আনা
হচ্ছে।
যন্তর মন্তর,
জনপথ,
নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও
দিল্লি
পুলিশের সদর
দপ্তর
ঘিরে
প্রায়
দেড়
কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হিসেবে
চিহ্নিত করা
হয়েছে।
সেখানে
ছয়
হাজার
৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রাখার
কথা
রয়েছে।
যন্তর
মন্তরমুখী সড়কগুলোতে তৈরি
করা
হয়েছে
অন্তত
সাত
স্তরের
ব্যারিকেড।
এ ছাড়া
বিক্ষোভের সময়
আটক
ব্যক্তিদের রাখার
জন্য
১২টি
আটককেন্দ্র প্রস্তুত করেছে
দিল্লি
পুলিশ।
নয়াদিল্লি ও
মধ্য
দিল্লির হোটেল,
লজ
ও
অতিথিশালাগুলোতেও তল্লাশি চালানো
হচ্ছে।
৪৫ মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ
ও
বের
হওয়ার
পথ
বন্ধ
নিরাপত্তার কারণে
দিল্লির ৪৫টি
মেট্রো
স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ
ও
বের
হওয়ার
পথ
বন্ধ
রাখা
হয়েছে।
দিল্লি
মেট্রো
রেল
করপোরেশন (ডিএমআরসি) প্রথমে
৫৭টি
স্টেশন
বন্ধ
রাখার
পরিকল্পনা করলেও
পরে
তা
কমিয়ে
৪৫টিতে
আনে।
৯ অক্টোবর রাত
৯টা
থেকে
১০
অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা
পর্যন্ত এ
বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার
কথা।
সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর মধ্যে
রয়েছে
জনপথ,
প্যাটেল চক,
সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব
চক,
নয়াদিল্লি, মান্ডি
হাউস,
আইটিও,
খান
মার্কেট, হাউজ
খাস,
লাজপত
নগর,
কাশ্মীরি গেট,
সিলামপুর, শাহদরা
ও
রিঠালা।
তবে অধিকাংশ স্টেশনে এক
মেট্রো
লাইন
থেকে
অন্য
লাইনে
যাওয়ার
সুবিধা
চালু
থাকবে।
শুধু
নয়াদিল্লি স্টেশনে এ
সুবিধা
পাওয়া
যাবে
না।
এ বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে করা
আবেদনের শুনানিতে ভারতের
সুপ্রিম কোর্ট
বলেছে,
জনপরিবহন পুরোপুরি বন্ধ
করে
দেওয়া
উচিত
নয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তিসংগত ও
আনুপাতিক ব্যবস্থা নেওয়ার
নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সাধারণ
যাত্রী,
কর্মজীবী মানুষ
ও
শিক্ষার্থীদের যাতায়াত যেন
অযথা
ব্যাহত
না
হয়,
সে
বিষয়েও
গুরুত্ব দেওয়া
হয়েছে।
চার কিলোমিটার এলাকায়
মোবাইল
ইন্টারনেট বন্ধ
নিরাপত্তার অংশ
হিসেবে
জনপথ
ও
কর্তব্য পথের
সংযোগস্থলকে কেন্দ্র করে
চার
কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায়
মোবাইল
ইন্টারনেট সেবা
বন্ধ
রাখা
হয়েছে।
৯
অক্টোবর রাত
১০টা
থেকে
১০
অক্টোবর রাত
১০টা
পর্যন্ত এ
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার
কথা।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর
দিল্লি
পুলিশের বিশেষ
শাখা
এ
নির্দেশ জারি
করেছে।
এয়ারটেল, জিও,
ভোডাফোন আইডিয়া
ও
এমটিএনএলকে নির্দেশ কার্যকর করতে
বলা
হয়েছে।
বিক্ষোভের জন্য
লোকজন
জড়ো
করার
চেষ্টা
হচ্ছে
কি
না,
তা
জানতে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি চালাচ্ছে প্রশাসন। বিভিন্ন অনলাইন
পোস্ট
ও
বার্তা
পর্যালোচনার জন্য
২০০-এর বেশি কনটেন্ট নির্মাতাকে নজরদারির আওতায়
রাখা
হয়েছে
বলে
জানা
গেছে।
স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অডিও
ও
ভিডিও
ধারণের
সুবিধাসহ ৩০০টির
বেশি
সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো
হয়েছে।
পুলিশের পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করতে
প্রায়
১০০
জন
আলোকচিত্রী ও
ভিডিও
ধারণকারীকে কাজে
লাগানো
হয়েছে
বলেও
জানা
গেছে।
বাতিল ২৫৪ ট্রেন,
ভোগান্তিতে যাত্রীরা
নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব
পড়েছে
রেল
চলাচলেও। ১০
অক্টোবর সকাল
চারটা
থেকে
দুপুর
দুইটা
পর্যন্ত মোট
২৫৪টি
ট্রেন
বাতিল
করা
হয়েছে।
এর
মধ্যে
৭৫টি
মেল
ও
এক্সপ্রেস ট্রেন
এবং
১৭৯টি
লোকাল
ট্রেন
রয়েছে।
এতে দিল্লির সঙ্গে
গাজিয়াবাদ, মিরাট,
পানিপথ
ও
কুরুক্ষেত্রের মতো
এলাকার
রেল
যোগাযোগ ব্যাহত
হয়েছে।
নয়াদিল্লি ও
হজরত
নিজামুদ্দিন স্টেশন
থেকে
যাত্রার আগে
ট্রেনের সর্বশেষ অবস্থা
যাচাই
করে
নিতে
যাত্রীদের পরামর্শ দেওয়া
হয়েছে।
তবে পুরোনো
দিল্লি,
আনন্দ
বিহার
ও
দিল্লি
ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন চালু
রয়েছে।
অন্যদিকে, নমো
ভারত
রেলের
সরাই
কালে
খান
ও
নিউ
অশোক
নগর
স্টেশন
৯
অক্টোবর রাত
৯টা
থেকে
১০
অক্টোবর রাত
১০টা
পর্যন্ত বন্ধ
রাখার
কথা।
দিল্লি-লখনউ
রেলপথেও প্রভাব
পড়েছে।
১০
অক্টোবর এ
পথে
চলাচলকারী একাধিক
ট্রেন
বাতিল
করা
হয়েছে।
এর
মধ্যে
রয়েছে
লখনউ
মেল
ও
নয়াদিল্লি-লখনউ
এসি
সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। এ
ছাড়া
১১
অক্টোবরের লখনউ-নয়াদিল্লি গোমতী এক্সপ্রেসও বাতিল
করা
হয়েছে।
৩০ সড়কে যান
চলাচলে
বিধিনিষেধের আশঙ্কা
দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ
প্রায়
৩০টি
সড়ক
চিহ্নিত করেছে,
যেখানে
১০
অক্টোবর সকাল
ছয়টা
থেকে
যান
চলাচলে
প্রভাব
পড়তে
পারে।
এসব
এলাকার
মধ্যে
রয়েছে
যন্তর
মন্তর,
কনট
প্লেস,
মান্ডি
হাউস,
প্যাটেল চক,
অশোকা
রোড,
জনপথ,
লোধি
রোড
ও
ধৌলা
কুয়ো।
ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দীনেশ
কুমার
গুপ্ত
জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী যান
চলাচলের পথ
পরিবর্তন করা
হবে।
তবে
কোনো
সড়ক
পুরোপুরি বন্ধ
করা
বা
যান
চলাচল
সম্পূর্ণ আটকে
দেওয়ার
পরিকল্পনা নেই।
জরুরি প্রয়োজন ছাড়া
অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে
চলতে
বলা
হয়েছে।
বাইরে
বের
হলে
হাতে
অতিরিক্ত সময়
রাখা
এবং
ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া
হয়েছে।
বিশেষ
করে
রেলস্টেশন, আন্তরাজ্য বাস
টার্মিনাল ও
বিমানবন্দরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক
থাকতে
বলা
হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে
৯
ও
১০
অক্টোবর দিল্লির সব
খুচরা
মদের
দোকান
বন্ধ
রাখার
সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়েছে।
কনট
প্লেসের নিউ
দিল্লি
ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনও শনিবার
দোকান,
কার্যালয়, রেস্তোরাঁ ও
অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ
রাখার
পরামর্শ দিয়েছে। ভাগীরথ
প্যালেস ও
চাঁদনি
চক
বাজার
কর্তৃপক্ষও বাজার
বন্ধ
রাখার
পরিকল্পনার কথা
জানিয়েছে।
উত্তর প্রদেশেও বাড়তি
সতর্কতা
সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে
উত্তর
প্রদেশেও উচ্চ
সতর্কতা জারি
করা
হয়েছে।
দিল্লিসংলগ্ন মিরাট
ও
বেরেলি
অঞ্চলের জেলাগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক
থাকতে
বলা
হয়েছে।
রাজধানীমুখী সড়কে
যানবাহনে তল্লাশি ও
নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া
হয়েছে।
লখনউ, আগ্রা,
মিরাট,
বেরেলি,
গাজিয়াবাদ, নয়ডা,
প্রয়াগরাজ ও
বারাণসীতে সম্ভাব্য বিক্ষোভ কর্মসূচির ওপর
নজর
রাখছে
প্রশাসন। গৌতম
বুদ্ধ
নগর
জেলায়
১০
থেকে
২০
অক্টোবর পর্যন্ত ভারতীয়
নাগরিক
সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩
ধারা
জারি
করা
হয়েছে।
বিক্ষোভ, উৎসব
ও
বিভিন্ন জনসমাবেশের সম্ভাবনার কথা
উল্লেখ
করে
এ
পদক্ষেপ নেওয়া
হয়েছে।
এদিকে, ভারতের
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন
৯
অক্টোবর দেশের
সব
রাজ্য
ও
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের চিঠি
দিয়েছেন। এতে
দিল্লি
পুলিশের সঙ্গে
সমন্বয়
করে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার
নির্দেশ দেওয়া
হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান
সিজেপি ও
অন্যান্য আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতারা
শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের
আহ্বান
জানিয়েছেন। সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ
দীপক
শুক্রবার রাতে
মুম্বাই থেকে
জানান,
শনিবার
সকালে
তিনি
দিল্লি
পৌঁছাবেন। সেখানে
পৌঁছানোর পর
তাঁকে
গ্রেপ্তার করা
হতে
পারে
বলেও
আশঙ্কা
প্রকাশ
করেন
তিনি।
তবে তাঁকে
গ্রেপ্তার করা
হলেও
আন্দোলন যেন
থেমে
না
যায়,
সে
আহ্বান
জানিয়েছেন তিনি।
একই
সঙ্গে
সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের
বার্তা
দিয়েছেন।
বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়া এবং সম্ভাব্য জমায়েত ঠেকাতে নেওয়া ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব ইতিমধ্যে দিল্লির গণপরিবহন, রেল যোগাযোগ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছে। এখন প্রশাসনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও যাতায়াত যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা।