ঢাকা    বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন, সড়কে প্রাণ গেল মাইশার



বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন, সড়কে প্রাণ গেল মাইশার
চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত।

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। এরপর ছোট ভাইকে নিয়ে দুই সন্তানের সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মা সালমা আক্তার। বড় মেয়ে মাইশা মুশফিরাতকে ঘিরেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে মেয়ে পরিবারের হাল ধরবেন, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে পাশে দাঁড়াবেন এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ২১ বছর বয়সী মাইশা।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায় মাইশাদের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। যে মেয়েকে ঘিরে স্বামী হারানোর শোক ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারাতে হলো তাঁকে।

মাইশা চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে তাঁর নানা পরিকল্পনা ছিল। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়াই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাইশা। প্রতিদিনের মতো বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন সড়কের পাশে। হয়তো ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন, সময় কাটাবেন ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু একটি বাসের চাপায় মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় তাঁর সব স্বপ্ন।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় যাত্রী ওঠানোর জন্য ধীরগতিতে চলা চট্টগ্রামমুখী ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাসকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় একটি ভারী লরি। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি উল্টে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

বাসটির নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাঁদের উদ্ধার করেন। পরে আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বেলা ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া বহিরাগত আরও একজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে তাঁদের ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত মাইশা হাসপাতালে মারা যান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম আশেক জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মাইশাকে বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া

মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী ও উপউপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসমত আলী হাসপাতালে ছুটে যান।

মাইশার মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে তাঁর পরিবারের ওপর। তিন বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে যে মেয়েকে অবলম্বন করে নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারালেন তিনি।

পড়াশোনা শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়ানো, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা—সব স্বপ্নই এখন অতীত। যে মেয়ের একদিন পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল, সেই মেয়ের নিথর দেহ নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে স্বজনদের।

বিষয় : সড়ক দুর্ঘটনা আইআইইউসি সীতাকুণ্ড মাইশা মুশফিরাত

দৈনিক নবকাল

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬


বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন, সড়কে প্রাণ গেল মাইশার

প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। এরপর ছোট ভাইকে নিয়ে দুই সন্তানের সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মা সালমা আক্তার। বড় মেয়ে মাইশা মুশফিরাতকে ঘিরেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে মেয়ে পরিবারের হাল ধরবেন, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে পাশে দাঁড়াবেন এমন প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ২১ বছর বয়সী মাইশা।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায় মাইশাদের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। যে মেয়েকে ঘিরে স্বামী হারানোর শোক ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারাতে হলো তাঁকে।

মাইশা চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে তাঁর নানা পরিকল্পনা ছিল। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়াই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাইশা। প্রতিদিনের মতো বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন সড়কের পাশে। হয়তো ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন, সময় কাটাবেন ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু একটি বাসের চাপায় মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় তাঁর সব স্বপ্ন।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় যাত্রী ওঠানোর জন্য ধীরগতিতে চলা চট্টগ্রামমুখী ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাসকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় একটি ভারী লরি। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি উল্টে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

বাসটির নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাঁদের উদ্ধার করেন। পরে আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বেলা ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া বহিরাগত আরও একজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে তাঁদের ওপর পড়ে। এতে গুরুতর আহত মাইশা হাসপাতালে মারা যান।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম আশেক জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মাইশাকে বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া

মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী ও উপউপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসমত আলী হাসপাতালে ছুটে যান।

মাইশার মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে তাঁর পরিবারের ওপর। তিন বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে যে মেয়েকে অবলম্বন করে নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সালমা আক্তার, সেই মেয়েকেও হারালেন তিনি।

পড়াশোনা শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়ানো, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা—সব স্বপ্নই এখন অতীত। যে মেয়ের একদিন পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল, সেই মেয়ের নিথর দেহ নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছে স্বজনদের।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার স্বপ্ন, সড়কে প্রাণ গেল মাইশার
0:00 0:00
1.0x