ঢাকা    রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
দৈনিক নবকাল

বরিশাল ডিসি কার্যালয়ে একই কাজে একাধিক বিল, পুরোনো যন্ত্রে নতুনের ভাউচার


শেখ মো: বেলায়েত হোসেন
শেখ মো: বেলায়েত হোসেন রিপোর্টার

বরিশাল ডিসি কার্যালয়ে একই কাজে একাধিক বিল, পুরোনো যন্ত্রে নতুনের ভাউচার
বাম দিক থেকে বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন ও ডানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিন। ছবি: সংগ্রহ

বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গত অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ের সময় ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের মধ্যে রয়েছেন কার্যালয়ের সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিন এবং কয়েকজন কর্মচারী।

অভিযোগ অনুযায়ী, একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল তোলা, চেকের মাধ্যমে বিল পরিশোধের পর তা আবার তুলে নেওয়া, পুরোনো প্রিন্টার ও কম্পিউটার কিনে নতুন যন্ত্রপাতির বিল দেখানো এবং বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার জমা দিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব কাজে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বাংলোর সাবেক সিএ এবং সাবেক নাজিরের সহায়তা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংস্কারকাজে দ্বিগুণ বিলের অভিযোগ

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি ভবনের নিচতলা ও ডিডিএলজি কক্ষ সংস্কারের জন্য ২০২৪ সালের ১২ মে ১২৯ নম্বর স্মারকে দুটি কোটেশনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়। ওই দুই কক্ষের মেরামত, টাইলস স্থাপন, দরজা-জানালা পরিবর্তন, স্যানিটারি ফিটিংসসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করে গণপূর্ত বিভাগ। এসব কাজের বিপরীতে ১৪ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়। ঠিকাদার মিলটন এক বছর আগেই কাজ শেষ করে বিল তুলে নেন।

অভিযোগ রয়েছে, একই দুটি কক্ষে পরবর্তী জুন ক্লোজিংয়ের সময় আবার টাইলস বসানো ও গ্রিল স্থাপনের কাজ দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকার বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়। অথচ এর আগে একই কক্ষে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছিল।

এবারের কাজের ঠিকাদার হিসেবে দেখানো হয় নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা এবং জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খানের বড় ভাই আক্তারুজ্জামান খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামান অ্যান্ড সন্সকে।

এ বিষয়ে আক্তারুজ্জামান *আমার দেশ*কে বলেন, তিনি আগে ঠিকাদারি করতেন, এখন আর করেন না। সাম্প্রতিক সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কাজ করেছেন কি না, জানতে চাইলে প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে সেখানে ঠিকাদারি কাজ করার কথা স্বীকার করলেও কবে, কী ধরনের এবং কত টাকার কাজ করেছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। একপর্যায়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

মনিহারি কেনার নামে ১১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

সূত্রের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মনিহারি সামগ্রী কেনার জন্য ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রকৃতপক্ষে এ খাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। অবশিষ্ট ২৪ লাখ টাকার মধ্যে জুন ক্লোজিংয়ের সময় ১১ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চাহিদাপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (এনডিসি) অনুমোদন ছাড়াই ১১টি বিলের মাধ্যমে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়। নগরীর বান্ধ রোডের লঞ্চঘাট এলাকার তালুকদার স্টোরস থেকে মুদি ও মনিহারি সামগ্রী কেনার নামে এসব বিল দেখানো হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, তালুকদার স্টোরসের নামে ১১ লাখ টাকার চেক প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে জমা দেওয়ার পর সেখান থেকে সমপরিমাণ অর্থের অগ্রিম চেক নিয়ে তা তুলে নেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খান আসাদ। সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভিনের নির্দেশে দোকানমালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ অর্থ উত্তোলন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তালুকদার স্টোরসের মালিক জাহানারা বেগম ও তাঁর স্বামী হুমাউন কবীর অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হুমাউন কবীর জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাছে তাঁদের আগের পাওনা অর্থও পরিশোধ করা হয়নি। তবে শিগগিরই তা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বাঁধাইয়ের কাজ না করেই পাঁচ লাখ টাকার বিল?

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখার ফাইলের কাভার, কর্মকর্তাদের হ্যান্ড নোটবুক এবং রেকর্ড রুমের নথি বাঁধাইয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকার বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, স্বীকৃত বাঁধাইখানা থেকে খাতাপত্র বাঁধাই করার কথা। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, তালুকদার স্টোরসের নামে বিল দেখানো হলেও সেখানে কোনো বাঁধাইয়ের কাজ করা হয়নি।

এ বিষয়ে হুমাউন কবীর জানান, প্রতিষ্ঠানটি তাঁর স্ত্রীর নামে হলেও বর্তমানে তিনি এটি দেখাশোনা করেন। তাঁদের দোকানে বাঁধাইয়ের কাজ হয় না। বাঁধাই ও মনিহারি সামগ্রী কেনার বিল-ভাউচারের বিপরীতে তাঁদের হিসাবে টাকা জমা হয়েছিল। পরে সমপরিমাণ টাকার চেক নিয়ে সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান সেই অর্থ তুলে নেন বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান আসাদ *আমার দেশ*কে বলেন, মনিহারি সামগ্রী কেনা ও বাঁধাইয়ের জন্য তালুকদার এন্টারপ্রাইজের হিসাবে দেওয়া বিলের টাকা তিনি চেকের মাধ্যমে তুলে আনেননি। তাঁর ভাইও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো কাজ করেননি। তবে কার্যালয়ের কেউ তাঁর ভাইয়ের লাইসেন্স ব্যবহার করে থাকতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। কে লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন, তা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে বলেও জানান আসাদ।

পুরোনো প্রিন্টার কিনে নতুনের বিল

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রিন্টার কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কয়েকটি পুরোনো বা সেকেন্ড হ্যান্ড প্রিন্টার কেনা হলেও বরিশালের আর্ক কম্পিউটার থেকে নতুন কম্পিউটার কেনার ভাউচার দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

শুধু প্রিন্টার নয়, এর আগে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার নামেও সরকারি অর্থের অনিয়ম হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম্পিউটার না কিনেই ভাউচার দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া জুন ক্লোজিংয়ের সময় সভা-সেমিনার, জ্বালানি ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

কল্যাণ তহবিলের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা শাখার কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কল্যাণ পরিদপ্তরের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন তুলনামূলক ছোট পরিসরে হওয়ায় তহবিলে ৭৭ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বরিশাল সিটি করপোরেশন ২৫ হাজার টাকা এবং জেলা পরিষদ ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিল।

সব মিলিয়ে ওই খাতে এক লাখ টাকার বেশি উদ্বৃত্ত থাকলেও সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিলে তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত নথি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভিনের বিরুদ্ধে আগের কর্মস্থলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে সেখানে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল বলেও সূত্রের দাবি।

তদন্তের আশ্বাস বর্তমান জেলা প্রশাসকের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত দুই দিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিনের কার্যালয়ে গিয়েও তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমান জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার *আমার দেশ*কে বলেন, ‘জুন ক্লোজিংয়ের সময় আমি ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে বলতে পারব না। এ ছাড়া পুরোনো প্রিন্টার কেনার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

তিনি আরও বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

বিষয় : দুর্নীতি বরিশাল জেলা প্রশাসন সরকারি অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচার

দৈনিক নবকাল

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬


বরিশাল ডিসি কার্যালয়ে একই কাজে একাধিক বিল, পুরোনো যন্ত্রে নতুনের ভাউচার

প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গত অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ের সময় ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগের মধ্যে রয়েছেন কার্যালয়ের সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিন এবং কয়েকজন কর্মচারী।

অভিযোগ অনুযায়ী, একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল তোলা, চেকের মাধ্যমে বিল পরিশোধের পর তা আবার তুলে নেওয়া, পুরোনো প্রিন্টার ও কম্পিউটার কিনে নতুন যন্ত্রপাতির বিল দেখানো এবং বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার জমা দিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব কাজে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বাংলোর সাবেক সিএ এবং সাবেক নাজিরের সহায়তা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার জানিয়েছেন, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংস্কারকাজে দ্বিগুণ বিলের অভিযোগ

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি ভবনের নিচতলা ও ডিডিএলজি কক্ষ সংস্কারের জন্য ২০২৪ সালের ১২ মে ১২৯ নম্বর স্মারকে দুটি কোটেশনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়। ওই দুই কক্ষের মেরামত, টাইলস স্থাপন, দরজা-জানালা পরিবর্তন, স্যানিটারি ফিটিংসসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করে গণপূর্ত বিভাগ। এসব কাজের বিপরীতে ১৪ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়। ঠিকাদার মিলটন এক বছর আগেই কাজ শেষ করে বিল তুলে নেন।

অভিযোগ রয়েছে, একই দুটি কক্ষে পরবর্তী জুন ক্লোজিংয়ের সময় আবার টাইলস বসানো ও গ্রিল স্থাপনের কাজ দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকার বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়। অথচ এর আগে একই কক্ষে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছিল।

এবারের কাজের ঠিকাদার হিসেবে দেখানো হয় নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা এবং জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খানের বড় ভাই আক্তারুজ্জামান খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স জামান অ্যান্ড সন্সকে।

এ বিষয়ে আক্তারুজ্জামান *আমার দেশ*কে বলেন, তিনি আগে ঠিকাদারি করতেন, এখন আর করেন না। সাম্প্রতিক সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কাজ করেছেন কি না, জানতে চাইলে প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে সেখানে ঠিকাদারি কাজ করার কথা স্বীকার করলেও কবে, কী ধরনের এবং কত টাকার কাজ করেছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি। একপর্যায়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

মনিহারি কেনার নামে ১১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

সূত্রের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মনিহারি সামগ্রী কেনার জন্য ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রকৃতপক্ষে এ খাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। অবশিষ্ট ২৪ লাখ টাকার মধ্যে জুন ক্লোজিংয়ের সময় ১১ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চাহিদাপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (এনডিসি) অনুমোদন ছাড়াই ১১টি বিলের মাধ্যমে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়। নগরীর বান্ধ রোডের লঞ্চঘাট এলাকার তালুকদার স্টোরস থেকে মুদি ও মনিহারি সামগ্রী কেনার নামে এসব বিল দেখানো হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, তালুকদার স্টোরসের নামে ১১ লাখ টাকার চেক প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে জমা দেওয়ার পর সেখান থেকে সমপরিমাণ অর্থের অগ্রিম চেক নিয়ে তা তুলে নেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খান আসাদ। সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভিনের নির্দেশে দোকানমালিকের সঙ্গে যোগসাজশ করে এ অর্থ উত্তোলন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তালুকদার স্টোরসের মালিক জাহানারা বেগম ও তাঁর স্বামী হুমাউন কবীর অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হুমাউন কবীর জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাছে তাঁদের আগের পাওনা অর্থও পরিশোধ করা হয়নি। তবে শিগগিরই তা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বাঁধাইয়ের কাজ না করেই পাঁচ লাখ টাকার বিল?

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখার ফাইলের কাভার, কর্মকর্তাদের হ্যান্ড নোটবুক এবং রেকর্ড রুমের নথি বাঁধাইয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকার বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, স্বীকৃত বাঁধাইখানা থেকে খাতাপত্র বাঁধাই করার কথা। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, তালুকদার স্টোরসের নামে বিল দেখানো হলেও সেখানে কোনো বাঁধাইয়ের কাজ করা হয়নি।

এ বিষয়ে হুমাউন কবীর জানান, প্রতিষ্ঠানটি তাঁর স্ত্রীর নামে হলেও বর্তমানে তিনি এটি দেখাশোনা করেন। তাঁদের দোকানে বাঁধাইয়ের কাজ হয় না। বাঁধাই ও মনিহারি সামগ্রী কেনার বিল-ভাউচারের বিপরীতে তাঁদের হিসাবে টাকা জমা হয়েছিল। পরে সমপরিমাণ টাকার চেক নিয়ে সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান সেই অর্থ তুলে নেন বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান আসাদ *আমার দেশ*কে বলেন, মনিহারি সামগ্রী কেনা ও বাঁধাইয়ের জন্য তালুকদার এন্টারপ্রাইজের হিসাবে দেওয়া বিলের টাকা তিনি চেকের মাধ্যমে তুলে আনেননি। তাঁর ভাইও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো কাজ করেননি। তবে কার্যালয়ের কেউ তাঁর ভাইয়ের লাইসেন্স ব্যবহার করে থাকতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। কে লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন, তা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে বলেও জানান আসাদ।

পুরোনো প্রিন্টার কিনে নতুনের বিল

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রিন্টার কেনার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কয়েকটি পুরোনো বা সেকেন্ড হ্যান্ড প্রিন্টার কেনা হলেও বরিশালের আর্ক কম্পিউটার থেকে নতুন কম্পিউটার কেনার ভাউচার দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

শুধু প্রিন্টার নয়, এর আগে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার নামেও সরকারি অর্থের অনিয়ম হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম্পিউটার না কিনেই ভাউচার দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া জুন ক্লোজিংয়ের সময় সভা-সেমিনার, জ্বালানি ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

কল্যাণ তহবিলের অর্থ নিয়েও প্রশ্ন

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা শাখার কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কল্যাণ পরিদপ্তরের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন তুলনামূলক ছোট পরিসরে হওয়ায় তহবিলে ৭৭ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বরিশাল সিটি করপোরেশন ২৫ হাজার টাকা এবং জেলা পরিষদ ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিল।

সব মিলিয়ে ওই খাতে এক লাখ টাকার বেশি উদ্বৃত্ত থাকলেও সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিলে তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত নথি বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সালমা পারভিনের বিরুদ্ধে আগের কর্মস্থলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে সেখানে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল বলেও সূত্রের দাবি।

তদন্তের আশ্বাস বর্তমান জেলা প্রশাসকের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত দুই দিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিনের কার্যালয়ে গিয়েও তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বর্তমান জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার *আমার দেশ*কে বলেন, ‘জুন ক্লোজিংয়ের সময় আমি ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে বলতে পারব না। এ ছাড়া পুরোনো প্রিন্টার কেনার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

তিনি আরও বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।


দৈনিক নবকাল

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কায়েস আহমেদ সেলিম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নবকাল
বরিশাল ডিসি কার্যালয়ে একই কাজে একাধিক বিল, পুরোনো যন্ত্রে নতুনের ভাউচার
0:00 0:00
1.0x