জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক বিরোধ ও সদস্যদেশগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জি-২০-এর কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে ২০২৬ সালের সম্মেলন সামনে রেখে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক
সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের
গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্প্রতি
এক মতামত নিবন্ধে এমন আশঙ্কার কথা
তুলে ধরেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষণা
প্রতিষ্ঠান এলএসই আইডিয়াসের সহযোগী অ্যান্ড্রু হ্যামন্ড।
জি-২০-এর এবারের
আয়োজন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার,
দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক এবং
রাশিয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক
কূটনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন
তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু
পরিবর্তন ও জ্বালানি রূপান্তরের
মতো বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠতে
পারে।
সংকট
মোকাবিলায় জি-২০-এর ভূমিকা
১৯৯৮
সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের
পর ১৯৯৯ সালে জি-২০ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্র। বৈশ্বিক
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, আর্থিক
সংকট মোকাবিলা এবং বিশ্বের প্রধান
অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো ছিল এই ফোরাম
গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০০৭
থেকে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক
আর্থিক সংকটের সময় জি-২০
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৯
সালের এপ্রিলে লন্ডন সম্মেলনে চাহিদা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর
লক্ষ্যে ১ দশমিক ১
ট্রিলিয়ন ডলারের সমন্বিত সহায়তা প্যাকেজে সম্মত হন বিশ্বনেতারা। তৎকালীন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের কূটনৈতিক উদ্যোগ ওই সমঝোতা অর্জনে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
সেই
অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, বড় অর্থনীতিগুলো সমন্বিতভাবে
কাজ করলে বৈশ্বিক সংকটের
প্রভাব কমানো সম্ভব। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বিভাজন দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পথ কঠিন করে
তুলছে।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘিরে
বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের
এবারের জি-২০ আয়োজন
নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয় দক্ষিণ আফ্রিকার
অংশগ্রহণ। গত বছর দক্ষিণ
আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ কার্যক্রম
বর্জন করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হত্যা ও জমি কেড়ে
নেওয়ার শিকার হিসেবে তুলে ধরে মার্কিন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অভিযোগ করেছিলেন,
তা এই বিরোধের পটভূমির
অংশ। তবে তাঁর এসব
অভিযোগ ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
এবার
যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে জি-২০-সংশ্লিষ্ট
কর্মসূচিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে পোল্যান্ডকে
অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ইউরোপের কয়েকটি দেশের আপত্তির কারণ হয়েছে। ফ্রান্সসহ
ইউরোপের কয়েকটি দেশের উদ্বেগ, জি-২০-এর
পূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ
আফ্রিকাকে আয়োজনের বাইরে রাখলে ফোরামটির অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এ
বিরোধ কেবল দুটি দেশের
সম্পর্কের বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক
ফোরামে সদস্যদের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ,
আয়োজক দেশের দায়িত্ব এবং বৈশ্বিক আলোচনার
গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও এটি প্রশ্ন তুলেছে।
‘নতুন জি-২০’ এজেন্ডায় জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগ
মার্কিন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বর্ণিত ‘নতুন জি-২০’
এজেন্ডা নিয়েও সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এজেন্ডায় জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, অভিবাসন, নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগের
মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জ্বালানি রূপান্তরের
মতো বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ অগ্রাধিকার ডিসেম্বরের
যৌথ ঘোষণার খসড়াতেও প্রভাব ফেলছে।
ফলে
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি রূপান্তর
নিয়ে সদস্যদেশগুলোর অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কঠিন
হতে পারে। তবে মতপার্থক্য থাকলেও
আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। যৌথ ঘোষণায় কোন
বিষয়গুলো স্থান পাবে, তা নিয়ে দর-কষাকষি এবারের সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে
পারে।
রাশিয়ার অভিযোগ, যৌথ
বিবৃতি ছাড়াই
বৈঠক
জি-২০-এর আয়োজক
হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে রাশিয়াও অসন্তোষ
জানিয়েছে। জি-২০ ও
এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত-অ্যাট-লার্জ মারাত বেরদিয়েভের অভিযোগ, ভিসা প্রত্যাখ্যান ও
স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে
রাশিয়ার প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজিত আর্থিক বৈঠকগুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিতে পারেননি।
এপ্রিল
মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে অনুষ্ঠিত জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের
বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি
ছাড়াই শেষ হয়। প্রচলিত
রীতি অনুযায়ী সেখানে সংবাদ সম্মেলনও হয়নি।
রাশিয়ার
অভিযোগগুলো মস্কোর বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে
অভিযোগের সত্যতা ও পরিসর নিয়ে
বিতর্ক থাকলেও বৈঠকে অংশগ্রহণের সুযোগ, প্রতিনিধিদের স্বীকৃতি এবং যৌথ সিদ্ধান্ত
গ্রহণের প্রক্রিয়া বহুপক্ষীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জি-২০-এর কার্যকারিতা
শুধু বৈঠক আয়োজনের ওপর
নির্ভর করে না। সদস্যদের
মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময় ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতায়
পৌঁছানোর সক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে সমান
গুরুত্বপূর্ণ।
ভূরাজনৈতিক বিভাজনে দুর্বল বহুপক্ষীয় সহযোগিতা
কোভিড-১৯ মহামারি ও
ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের
বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর
মধ্যে উত্তেজনা, রাশিয়াকে ঘিরে বিরোধ এবং
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকে কূটনৈতিক সংঘাত জি-২০-এর
কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।
এ
পরিস্থিতিতে এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক
নেতৃত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। জি-২০
ও জি-৭-এর
মতো বহুপক্ষীয় ফোরাম ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ভূমিকা
রাখতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র
আগামী বছর জি-৭-এরও আয়োজন করবে।
ফলে এবারের জি-২০ সম্মেলনে
সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আলোচনার পদ্ধতি এবং যৌথ অবস্থান
তৈরির অভিজ্ঞতা পরবর্তী আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোর জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
বৈশ্বিক সংকটে
সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
মহামারি,
আর্থিক বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের
মতো সমস্যা কোনো একক দেশের
পক্ষে পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
এসব ক্ষেত্রে তথ্য বিনিময়, অর্থনৈতিক
নীতির সমন্বয়, যৌথ সিদ্ধান্ত এবং
পারস্পরিক আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জি-২০-এর মতো
ফোরাম এসব বিষয়ে আলোচনার
সুযোগ তৈরি করতে পারে।
যদিও সদস্যদেশগুলোর মতপার্থক্যের কারণে সব সময় অভিন্ন
সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, তবু
সহযোগিতার কাঠামো সচল রাখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের জি-২০ সভাপতিত্ব তাই ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ হওয়ার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় কূটনীতির কার্যকারিতা ধরে রাখার পরীক্ষাও। সদস্যদেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, মতপার্থক্য গ্রহণযোগ্যভাবে সামাল দেওয়া এবং যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জি-২০ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।